শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদন

ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া শুল্ক ফাঁকি দিতে চীনকে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া শুল্ক ফাঁকি দিতে চীনকে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আরোপিত কঠোর বাণিজ্য শুল্ক এড়াতে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশ চীনকে সহায়তা করেছে বলে হোয়াইট হাউসের একটি সাম্প্রতিক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম শুল্ক সুবিধার সুযোগ নিতে চীনা উৎপাদকরা ওই সব তৃতীয় দেশের মাধ্যমে নিজেদের পণ্য ঘুরিয়ে পাঠিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে পরিচালিত এই সরবরাহ নেটওয়ার্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ওয়াশিংটন মনে করছে। হোয়াইট হাউসের এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের নামও উঠে এসেছে।

 

এসব দেশের মধ্যে কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ রয়েছে, যাদের ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ চীনা পণ্য নির্বিঘ্নে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই দেশগুলোর বাণিজ্যিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে চীন কয়েক হাজার কোটি ডলারের শুল্ক ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।

 

হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছেন, অবৈধভাবে পণ্য প্রবেশ করার এই প্রক্রিয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, শুল্ক ফাঁকির এই সুপরিকল্পিত কৌশল আমেরিকার অর্থনীতির জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করেছে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক পরিভাষায় এই ধরনের কৌশলকে ‘পণ্য পুনঃপ্রেরণ’ বা ট্রান্সশিপমেন্ট বলা হয়। এর অর্থ হলো, কোনো পণ্য মূল গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পরিবহন করা।

 

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় চীন তৃতীয় দেশগুলোকে কেবল যাত্রাবিরতির স্থান হিসেবে ব্যবহার করেনি, বরং সেখানে পৌঁছানোর পর পণ্যের গায়ে থাকা উৎপত্তিস্থলের লেবেল পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্যাকেটজাত করেছে।

 

হোয়াইট হাউস চীনের এই কৌশলকে ‘কাগজপত্রের আড়ালে লুকানো প্রতারণা’ হিসেবে কঠোর ভাষায় আখ্যায়িত করেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই শুল্ক ফাঁকির আর্থিক পরিমাণ রীতিমতো উদ্বেগজনক।

 

প্রায় ৩০ বিলিয়ন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য উচ্চ শুল্ক এড়াতে কম শুল্কের দেশের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই বিশাল ও অত্যন্ত জটিল বৈশ্বিক ছায়া পণ্য পুনঃপ্রেরণ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে হোয়াইট হাউস তাদের প্রতিবেদনে আরও গুরুতর মন্তব্য করেছে।

 

সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমানে সংঘটিত এই পণ্য পুনঃপ্রেরণ কেলেঙ্কারির গতি ও পরিসর অতীতের যেকোনো আধুনিক চোরাচালান পদ্ধতিকে হার মানিয়েছে। চীনের এই শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার কার্যক্রম এখন একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে, যার বিস্তার, গভীরতা ও জটিলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

তবে এই বিশাল প্রতারণার জাল উন্মোচন করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পণ্য পুনঃপ্রেরণের এই অভিনব প্রচেষ্টাগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে।

 

এই অভিযোগের বিষয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। দূতাবাসের এক মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষেরই বিজয়ী হওয়ার সুযোগ নেই।

 

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক একতরফা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ এবং চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করার তীব্র বিরোধিতা করেছে বেইজিং। ওই মুখপাত্র আরও যোগ করেন যে, পণ্য পুনঃপ্রেরণ সংক্রান্ত যেকোনো একতরফা আইনি পদক্ষেপ যেন কোনোভাবেই তৃতীয় কোনো পক্ষের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

 

এদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে যেসব দেশের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, তাদের মার্কিন দূতাবাসগুলোর সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যখন একের পর এক পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা ঘটছে, ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তেই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়াশিংটনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের প্রস্তুতির মধ্যেই এমন অভিযোগ দুই দেশের অমীমাংসিত বিরোধকে আরও জটিল করে তুলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দুই দেশের মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘদিনের পুরোনো হলেও সম্প্রতি তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

 

২০২৫ সালের মে মাসে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর অধিকাংশ শুল্ক আরোপ স্থগিত করতে উভয় দেশ সম্মত হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। এরপরও ওয়াশিংটন ও বেইজিং একে অপরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখেছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে মানবসদৃশ রোবট রপ্তানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

 

জবাবে চীনও উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

 

তার লক্ষ্য ছিল শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি শক্তিশালী করা। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি বাতিল করে দেয়। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিকল্প আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে বারবার নতুন করে শুল্ক আরোপের এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন।