শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদেশি ড্রোনে ট্রাম্প প্রশাসনের শতভাগ শুল্ক আরোপ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

বিদেশি ড্রোনে ট্রাম্প প্রশাসনের শতভাগ শুল্ক আরোপ
ছবি : Collected

চীনের আধিপত্য বিস্তারকারী ড্রোন শিল্পকে প্রতিহত করতে এবং নিজ দেশে ড্রোন উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করার দীর্ঘদিনের নীতি বাস্তবায়নে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিদেশি ড্রোনের ওপর একশ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক কার্যকর করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করল।

 

বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়া এই নতুন বাণিজ্যিক নিয়মের আওতায় পঁচিশ কেজির বেশি ওজনের এবং তাপীয় চিত্রায়ণ প্রযুক্তি বা থার্মাল ইমেজিং সমৃদ্ধ যেকোনো বিদেশি ড্রোনের ওপর শতভাগ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

 

অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের সাধারণ বিদেশি ড্রোনের ক্ষেত্রে পঁচিশ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শুল্ক নীতির কারণে দেশটিতে সরকারি সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

 

কারণ আমেরিকায় ব্যবহৃত অত্যন্ত কার্যকর ও উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোনের একটি বিশাল অংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে গহিন বনাঞ্চলের দাবানল পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কিংবা রাতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করতে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কাছে এই ড্রোনগুলো অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের এক তদন্তে বিদেশি ড্রোন ও যন্ত্রাংশের ওপর অতিনির্ভরশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার পরই মূলত এই উচ্চমাত্রার শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য চীনের শেনজেনভিত্তিক শীর্ষ ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ডিজেআই-এর একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দেওয়া। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ড্রোনের বাজারের সত্তর শতাংশের বেশি এই একক চীনা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে এই সংবেদনশীল প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা অবিলম্বে কমিয়ে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। তবে শিল্প বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

তাদের মতে, আমেরিকার দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র এখনও বিদেশি সমমানের বিকল্প প্রস্তুত করার সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে প্রশাসনের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন সুফলের চেয়ে মার্কিন অর্থনীতি ও জননিরাপত্তায় ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

 

জননিরাপত্তায় নিয়োজিত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্তের কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্লিভল্যান্ডের পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপক সদস্যদের নিয়ে গঠিত লেক কাউন্টি ড্রোন ইউনিটের প্রধান স্কট ম্লাকার এই নতুন শুল্ককে চরম আর্থিক বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিনি জানান, রাতে নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা এবং অপরাধীদের গতিবিধি শনাক্তে তাদের দল প্রতিদিন এই থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করে থাকে। শুল্ক বৃদ্ধির কারণে এখন মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি সাধারণ ও জরুরি সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে যাবে।

 

তাঁর মতে, এটি জাতীয় সুরক্ষার চেয়ে বরং বিদেশি প্রতিযোগিতা দমিয়ে মার্কিন ড্রোন নির্মাতাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষার এক ধরনের অন্যায্য সংরক্ষণবাদী নীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। চরম শুল্কের এই বোঝা কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মিত্রদের ওপরও পড়েছে।

 

মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার যে আশা ছিল, এই পদক্ষেপে তাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং তাইওয়ানে প্রস্তুতকৃত ড্রোনের ওপর পনেরো শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত পণ্যের ওপর দশ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে মিত্র দেশগুলোও সম্পূর্ণ ছাড় পায়নি।

 

এদিকে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন সাধারণ বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত তাপীয় চিত্রায়ণ ও তরল স্প্রে করার মতো প্রযুক্তিধারী ড্রোনগুলোকে সরাসরি সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে পুনর্শ্রেণীভুক্ত করার যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তুলেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা পূর্ববর্তী তারিখ থেকে কার্যকর এক নজিরবিহীন বিধিনিষেধ তৈরি করবে, যা বর্তমানে দেশজুড়ে হাজার হাজার মার্কিন ব্যবসা ও জননিরাপত্তা সংস্থায় ব্যবহৃত প্রচলিত ড্রোনগুলোর বৈধতা কেড়ে নেবে।

 

লাস ভেগাসে আয়োজিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক ড্রোন প্রদর্শনীতেও বিষয়টি নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। পেশাদার আকাশচিত্রগ্রাহক ও বাণিজ্যিক ড্রোন পরিচালনাকারীদের মতে, উপযুক্ত দেশীয় বিকল্প ছাড়া এমন বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা আক্ষরিক অর্থেই মার্কিন ড্রোন শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

 

নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত বৃহৎ ড্রোনবহর পরিচালনাকারী ডব্লিউ এম জর্ডান কোম্পানির বিশেষজ্ঞ জাস্টিন জোন্স সতর্ক করে বলেছেন যে, এই নীতির ফলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর কোটি কোটি ডলার আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

 

বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত ড্রোন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু স্কাইস ড্রোনের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে যে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, অবকাঠামো জরিপ কিংবা কৃষিকাজে ব্যবহৃত স্বাভাবিক সেন্সরকে সামরিক আখ্যা দিয়ে এমন বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে একটি অপরিহার্য উৎপাদনশীল শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।

 

নীতিগত এই উত্তেজনার মধ্যেই পুরো সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ দুই ছেলে এরিক ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ডোমিনারি হোল্ডিংস নামের যে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, সেটি আমেরিকার অন্যতম প্রধান ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাসে বড় ধরনের অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

 

এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ড্রোন যন্ত্রাংশ নির্মাণকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আনইউজুয়াল মেশিনসের উপদেষ্টা বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গৃহীত এই চরম সংরক্ষণবাদী শুল্ক নীতি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাবে, নাকি সামগ্রিক বাণিজ্য ও সেবামূলক ক্ষেত্রগুলোকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করবে, তা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।