তিনি সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, দেশের কৃষিখাত যখন সম্পূর্ণ দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য যখন জ্বালানির আকাশছোঁয়া মূল্য পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক 'বিপজ্জনক বিভ্রমের' মধ্যে বসবাস করছেন।
শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইরান বর্তমান সময়ে অতীতের যেকোনো মুহূর্তের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছে বলেও তিনি গভীর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে সিনেটর মারফি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের পরিচালিত নীতিকে ‘অকারণ আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এই আগ্রাসী ও অদূরদর্শী নীতির ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরে তিনি জানান, চলমান এই সংঘাতে ইতিমধ্যে আঠারো জন মার্কিন নাগরিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। পাশাপাশি, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত কোটি ডলারের ব্যাপক বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও কৌশলগত চিন্তার বিষয় হলো, অবিরাম এই সামরিক উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল ও অপূরণীয় হুমকি।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির করুণ চিত্র তুলে ধরে সিনেটর মারফি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিখাতে বর্তমানে যে চরম দেউলিয়াত্ব দেখা দিয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি যখন ধ্বংসের মুখে, ঠিক সেই একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রতিদিনের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিদারুণভাবে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের ভেতরের এই চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং বাইরের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
মারফির মতে, এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে ইরান গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে, অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনও প্রকৃত বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে এক বিপজ্জনক কল্পরাজ্যে বিচরণ করছেন।
ডেমোক্র্যাট দলের এই প্রথম সারির নেতার পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপের এমন কঠোর সমালোচনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী বৈদেশিক নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
সিনেটর মারফি শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলে আসছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা এই অঘোষিত যুদ্ধটি এমন একটি সংঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোনোভাবেই জয় করা সম্ভব নয়। এই অপরিণামদর্শী যুদ্ধের যে ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর পরিণতি দেশটিকে প্রতিনিয়ত ভোগ করতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত করে বলার মতো নয়, বরং এটাই এখন রূঢ় বাস্তবতা।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইতিমধ্যেই চরমভাবে পরাজিত হয়েছেন। সামরিক এই সংঘাত যত বেশি দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ততটাই দুর্বল ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং এর ঠিক বিপরীতে ইরান নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয়কে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করছে।
মার্কিন সিনেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে ক্রিস মারফি অবিলম্বে এই আত্মঘাতী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনোভাবেই এই অন্তহীন সংঘাত আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।
কারণ, এই অকারণ যুদ্ধের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল সামরিক ও আর্থিকভাবেই দুর্বল করছে না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করছে।
একই সঙ্গে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এক অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের হারানো সম্মান দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য অবিলম্বে এই আত্মঘাতী বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সামরিক আগ্রাসনের পথ পরিহার করে অতিসত্বর বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন।