ইরানের বিরুদ্ধে চলমান রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দূরপাল্লার অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এই গোপন তথ্য কীভাবে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছাল, তা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য পাচারকারীকে শনাক্ত করার লক্ষ্যে গত আগস্ট মাসে পেন্টাগনের অন্তত ৫০ জন উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার ওপর পলিগ্রাফ বা মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এই চরম অস্থিরতার চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, পলিগ্রাফ পরীক্ষার এই কঠোর তদন্তের আওতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সামরিক পরামর্শ প্রদানকারী জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট স্টাফের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে সিবিএস নিউজের বিশদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অত্যন্ত গোপনীয় এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সরাসরি জড়িত ছিল না। এর পরিবর্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের নিজস্ব অত্যন্ত দক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্তকারীদের মাধ্যমেই এই স্পর্শকাতর পরীক্ষাটি অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করেছে।
তবে সামরিক কাঠামোর শীর্ষস্থানীয় সকল নেতার ওপর এই পরীক্ষা প্রয়োগ করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই কঠোর তদন্ত প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ আওতামুক্ত ছিলেন।
অত্যন্ত সংবেদনশীল এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছেন। তিনি প্রকাশ্যে সমরাস্ত্র ঘাটতির এই চাঞ্চল্যকর খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে দাবি করেছেন।
ট্রাম্প দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রাগারে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ ও আধুনিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে। ক্ষুব্ধ ট্রাম্প এই তথ্য ফাঁসের ঘটনাকে সরাসরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য’ এবং ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি হুংকার দিয়ে বলেছেন, যারা এই ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে এবং দেশের প্রচলিত আইনে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর কারাদণ্ড নিশ্চিত করা হবে।
সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, পলিগ্রাফ পরীক্ষা চলাকালে কোনো কর্মকর্তাই গণমাধ্যমের কাছে তথ্য পাচার করেছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যর্থ হননি। অর্থাৎ মিথ্যা শনাক্তকারী যন্ত্রে কারও অপরাধ সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। তবে এই ফলাফল মার্কিন তদন্তকারীদের স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাদের উদ্বেগ আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
কারণ, সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত অস্ত্রের মজুতসংক্রান্ত এই অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যে প্রবেশাধিকার পেন্টাগনের খুব সীমিত ও হাতে গোনা কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অভ্যন্তরীণ কেউ দোষী প্রমাণিত না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে, মার্কিন প্রশাসনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত স্তরে হয়তো কোনো বিদেশি গুপ্তচর অত্যন্ত সুকৌশলে কাজ করছে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই পাচারের কাজটি সম্পন্ন করেছে।
পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র শন পারনেল এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্ক ও পেশাদার অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর সাধারণত তাদের অভ্যন্তরীণ কর্মী ব্যবস্থাপনা বা চলমান কোনো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করা থেকে সর্বদা বিরত থাকে।
তবে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, যেকোনো ধরনের শ্রেণিবদ্ধ বা অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য ফাঁসের বিষয়টিকে পেন্টাগন সর্বদা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং সেই অনুযায়ী অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে থাকে।
পলিগ্রাফ পরীক্ষা নেওয়ার এই সর্বশেষ উদ্যোগের আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগে আরও বেশ কিছু অননুমোদিত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ছিল খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ‘অর্ডারস বুক’ বা আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকার একটি অত্যন্ত গোপনীয় অংশ ফাঁস হয়ে যাওয়া।
গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া ওই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর চার তারকা পদমর্যাদার অন্তত ছয়জন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মূল নীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের জোরালো ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন।
ওই জ্যেষ্ঠ জেনারেলরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, সমরাস্ত্র ও রসদের বর্তমান অবস্থায় ইরানের মতো একটি শক্তিশালী ও আঞ্চলিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে এই ধরনের ব্যাপক মাত্রার যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে কোনোভাবেই টেকসই নয়।
একই সঙ্গে এই অবিরাম সংঘাত বিশ্বব্যাপী মার্কিন বাহিনীর সামগ্রিক সামরিক প্রস্তুতি ও সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে বলেও তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নথিপত্র ফাঁসের সেই ঘটনাটিকে সরাসরি একটি গুরুতর ‘অপরাধ’ এবং ‘সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন।
তিনি দাবি করেছেন, ভিন্নমত পোষণকারী জেনারেলদের বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব স্পর্শকাতর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তার একটি বড় অংশই ভুল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরঞ্জিত।
তবে অস্বীকার ও নিন্দার ভাষা যতই কড়া হোক না কেন, পর পর এসব তথ্য ফাঁসের ঘটনা মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যকার গভীর ফাটল এবং যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নিয়ে চরম অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের বিষয়টিকেই আন্তর্জাতিক মহলের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে।