দেখতে দেখতে এই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইতিমধ্যেই দীর্ঘ সাত মাসে পদার্পণ করেছে। প্রলম্বিত এই সামরিক সংঘাতে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ ও সেনাসদস্যের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এত বিপুল পরিমাণ প্রাণহানি ও অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই যুদ্ধকে অত্যন্ত তুচ্ছ ও সাধারণ ঘটনা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
তিনি চলমান এই ভয়াবহ সংঘাতকে একটি ‘ছোট গোল আলু’ বা অত্যন্ত সামান্য বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং তেহরান একে যুদ্ধকে খাটো করে দেখানোর একটি সুকৌশলী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা হিসেবেই বিবেচনা করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অবজ্ঞাপূর্ণ ও সংবেদনশীলতাহীন মন্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও বিশ্লেষণধর্মী জবাব দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি। সংস্থাটি তাদের এক বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে ‘ছোট গোল আলুর জন্য বড় বিল দিচ্ছেন ট্রাম্প’ শিরোনামে একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করেছে।
ওই সংবাদ প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধকে যতই গুরুত্বহীন ও ক্ষুদ্র প্রমাণের চেষ্টা করুক না কেন, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ শুরুর দীর্ঘ সাত মাস পর এই সংঘাত খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই এক বিশাল রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান চরম অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আকাশছোঁয়া সামরিক ব্যয় এবং খোদ মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া-সব মিলিয়ে এই সংঘাত ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির ওপর অভাবনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের সৃষ্টি করেছে, যা সামাল দিতে মার্কিন প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রারম্ভে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় ধারণা ছিল যে, অভাবনীয় সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে খুব দ্রুত এবং সহজেই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের যাবতীয় শর্তাবলি মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু রণক্ষেত্রের রূঢ় বাস্তবতা মার্কিন প্রশাসনের সেই পূর্বানুমানকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে।
মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের মুখে বিন্দুমাত্র পিছু না হটে ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের ধারাবাহিক সামরিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে এই সংঘাত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্লান্তিকর যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কোষাগারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ বহুমূল্যবান গোলাবারুদ ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো ও সরঞ্জাম পুনর্নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যুদ্ধ যদি অচিরেই শেষও হয়, তবুও এই বিশাল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি চাপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সহসাই মুক্তি পাবে না বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে মনে করছেন। চলমান এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা।
আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন করা হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রণালির স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
এর প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ যেমন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তেমনি খোদ মার্কিন নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভারও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার এই অপ্রত্যাশিত সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এক মারাত্মক শঙ্কার জন্ম দিয়েছে, যা মার্কিন সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশার সৃষ্টি করছে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মেহের নিউজের ওই প্রতিবেদনে একটি সাম্প্রতিক ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বর্তমান যুদ্ধংদেহী কর্মকাণ্ডে দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ সাধারণ নাগরিক গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনগণের এই প্রবল অসন্তোষ আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের জন্য এক বিশাল ও অনতিক্রম্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এমনকি এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খোদ রিপাবলিকান দলের ভেতরেও মারাত্মক আদর্শিক বিভক্তি ও কোন্দলের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত উঠে আসছে। পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ভয়াবহ সংঘাতকে শব্দজালের মাধ্যমে যতই তুচ্ছ প্রমাণের চেষ্টা করুন না কেন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় বাস্তবতায় এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক চরম সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বোঝার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।