বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কানাডার দুগ্ধজাত সামগ্রী ও অ্যালকোহল আমদানিতে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০২ এএম

কানাডার দুগ্ধজাত সামগ্রী ও অ্যালকোহল আমদানিতে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা
ছবি : Collected

ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যকার ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক এবং বহুমুখী অংশীদারত্বকে একপাশে ঠেলে দিয়ে এক সর্বাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। চলমান এই সংঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়ে এবার কানাডা থেকে দুগ্ধজাত পণ্য, অধিকাংশ অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং মোটরসাইকেল আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস প্রশাসন।

 

আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং দ্য গার্ডিয়ানের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এই কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হতে চলেছে।

 

উত্তর আমেরিকার দুই বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদারের মধ্যে এমন নজিরবিহীন বাণিজ্যিক সংঘাত কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

 

মার্কিন প্রশাসনের এই চরম পদক্ষেপকে মূলত কানাডার সাম্প্রতিক পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছিল কানাডা সরকার।

 

অটোয়ার এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি কেনাকাটা ও চুক্তিগুলো থেকে কানাডীয় পণ্য ও সংস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছেন।

 

মার্কিন কেন্দ্রীয় কেনাকাটা পরিচালনাকারী সংস্থা জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কানাডা যতক্ষণ পর্যন্ত মার্কিন পণ্যের ওপর সমতাভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং ন্যায্য পারস্পরিক সুযোগ নিশ্চিত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মার্কিন সরকারের কোনো বাণিজ্যিক চুক্তির আওতায় দেশটির পণ্য বা সংস্থাকে যোগ্য বলে বিবেচনা করা যাবে না।

 

উভয় দেশের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক অচলাবস্থার সূত্রপাত মূলত কয়েক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমেই হয়েছিল। গত ২২ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে কানাডীয় আমদানির ওপর সরাসরি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়।

 

ওয়াশিংটনের সেই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাব দিতেই কানাডা অতি দ্রুততার সঙ্গে শত শত আমেরিকান পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ এবং ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কানাডার অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে আমেরিকান ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, প্রক্রিয়াজাত পনির, প্রসাধন সামগ্রী এবং ভারী কৃষিসরঞ্জাম।

 

প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় যে পরিমাণ পণ্যসামগ্রী রফতানি করেছিল, তার প্রায় ৬ শতাংশ বা ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্য এখন কানাডার এই কঠোর শুল্কের সরাসরি খড়্গের মুখে পড়েছে। এর ফলে দুই দেশের সাধারণ উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন।

 

এই অর্থনৈতিক সংঘাতের মুখে কোনো ধরনের নতি স্বীকার না করে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বাহ্যিক কোনো অর্থনৈতিক চাপের মুখে পিছু না হটে দেশের অভ্যন্তরীণ স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করাই এখন অটোয়ার প্রধান জাতীয় লক্ষ্য।

 

প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বের কোনো দেশই যেন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে কানাডাকে অর্থনৈতিকভাবে জিম্মি করার স্পর্ধা দেখাতে না পারে, সে বিষয়ে তার প্রশাসন সম্পূর্ণ সজাগ ও বদ্ধপরিকর। এদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও উত্তেজনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে।

 

বিশেষ করে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর সংক্রান্ত ট্রাম্পের ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য কানাডীয় জনগণের জাতীয় আত্মমর্যাদায় গভীর আঘাত হেনেছে। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ পরিহারের পাশাপাশি মার্কিন উৎপাদিত পণ্য বর্জনের স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছেন।

 

উত্তেজনাকর এই বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগের সূত্রগুলো কিন্তু পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঙ্কের মুখপাত্র গাব্রিয়েল ব্রুনেট জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যকার মন্ত্রী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা স্থগিত থাকলেও সংকট নিরসনে উভয় দেশের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

 

তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাল্টাপাল্টি শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার যে বিপজ্জনক চক্রব্যূহ তৈরি হয়েছে, তা থেকে সহজে বেরিয়ে আসা কঠিন। বিশেষ করে দুগ্ধ, পানীয় এবং শিল্পের মতো স্পর্শকাতর খাতগুলোতে সরাসরি বিধিনিষেধ নেমে আসায় সীমান্ত সংলগ্ন বহু প্রতিষ্ঠান মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে পারে।

 

উত্তর আমেরিকার বৃহত্তর বাণিজ্যিক চুক্তি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে দুই দেশকে অবিলম্বে এই অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে, অন্যথায় এর চড়া মাশুল গুনতে হবে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ও ভোক্তাদের।

 

- দ্য গার্ডিয়ান