প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, ইরানের সাথে এই সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত ও গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এর পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে পশ্চিমা মিত্রজোটগুলোর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলগত অঞ্চল থেকে মার্কিন নৌবহর সরিয়ে নেওয়া এবং সর্বোপরি সামরিক বাহিনীকে চরমভাবে রাজনীতিকরণের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো তাদের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পার্সটুডে ও ইরানি গণমাধ্যম ইসনার সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুর্বলতা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ওই বিস্তারিত প্রতিবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বেশ কিছু হঠকারী ও অপরিপক্ব কৌশলগত সিদ্ধান্তের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, ইরানের মতো একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও মজুতকৃত গোলাবারুদের একটি বিশাল অংশ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেছে।
আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের এই শূন্যস্থান পূরণে যে পরিমাণ সময় ও অর্থের প্রয়োজন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, ঠিক এমন এক সংকটময় সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন নৌবহর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন ওই অঞ্চলে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করার এই পদক্ষেপ মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর জন্যই এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন আধিপত্য ও প্রভাব যে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সামরিক সক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত অবক্ষয়ের বিষয়টিও এই প্রতিবেদনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমস দাবি করেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ব্যক্তিগতভাবে অনুগত ও রাজনৈতিকভাবে মতাদর্শিক কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ ও অভিজ্ঞ কমান্ডারদের অত্যন্ত সুকৌশলে সরিয়ে দিচ্ছেন।
একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ সামরিক বাহিনীকে এভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড, পেশাদারি সক্ষমতা এবং সাধারণ সৈনিকদের মনোবলকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মেধা ও অভিজ্ঞতার বদলে অন্ধ আনুগত্যকে পদোন্নতি বা দায়িত্বশীল পদে নিযুক্তির মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করার কারণে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার অন্তর্নিহিত শক্তি হারিয়ে ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছেও এক ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
এই ধারাবাহিক ভুল পদক্ষেপগুলোর কারণে পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক জোটগুলো এখন কার্যত ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা ও আগ্রাসী নীতিমালার কারণে ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে।
পশ্চিমা জোটগুলোর এই অভ্যন্তরীণ ফাটল ও ধ্বংসের পদধ্বনি যুক্তরাষ্ট্রের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আরও বেশি সাহসী ও বেপরোয়া করে তুলছে।
নিউইয়র্ক টাইমস অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে মন্তব্য করেছে যে, বর্তমান প্রশাসন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার ঠিক কতটা গভীর ও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন।
সবশেষে, বর্তমান এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে পত্রিকাটি। তাদের মতে, ট্রাম্প ও হেগসেথের বর্তমান কর্মকাণ্ড সমগ্র দেশটিকে শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও অন্ধকার দিনগুলোর চেয়েও অনেক বেশি নাজুক ও বিপজ্জনক এক খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
সামরিক শক্তির অহংকার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এই আত্মঘাতী নীতি অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক পরাশক্তির মর্যাদাকেই চরম হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।