আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল আরাবিয়ার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে নিজেদের নিরাপত্তা ও সামরিক আধিপত্য রক্ষায় প্রয়োজনে ইরানের বাণিজ্যিক ও অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজে নিয়মিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখবে পেন্টাগন।
ওমান উপসাগর, পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের এমন অনমনীয় ও আক্রমণাত্মক মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, ইরান আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে সুপরিকল্পিতভাবে সমুদ্রে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ধারাবাহিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
তিনি কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, তেহরান যখনই এমন আগ্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে কিংবা ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়ার সামান্যতম চেষ্টা চালাবে, তখনই তাদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে সরাসরি আঘাত হেনে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে সাগরে ডুবিয়ে বা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এমনকি যেকোনো সময় বা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এমন বিধ্বংসী সামরিক পদক্ষেপ আবারও দৃশ্যমান হতে পারে বলেও খোলামেলা ইঙ্গিত প্রদান করেন তিনি। রুবিওর এই বক্তব্য সুস্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি রুটে নিজেদের স্বার্থের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাত প্রতিহত করতে মার্কিন প্রশাসন কোনো প্রকার ছাড় বা নমনীয়তা প্রদর্শন করতে রাজি নয়।
এই চরম উত্তেজনার পটভূমিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, গত আট সেপ্টেম্বর তাদের বিশেষ সামরিক বাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করে ওমান উপসাগর এবং সংলগ্ন সামুদ্রিক এলাকায় ইরানের পাঁচটি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।
সেন্টকমের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, উক্ত অভিযানের আগের দুই দিনে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে দুটি পৃথক সামরিক ঘটনায় একটি নিয়মিত টহলরত মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপর তেহরানের সেই আগ্রাসী ও সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তাৎক্ষণিক সামরিক জবাব এবং উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই মূলত ইরানি জ্বালানি পরিবহনকারী ট্যাংকার বহরকে সরাসরি নিশানা বানিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, আইআরজিসির নিক্ষিপ্ত সেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নিজস্ব উন্নত নিরাপত্তা বলয় ও স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং মার্কিন নৌযানটি সম্পূর্ণ নিরাপদে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই সামরিক ঘটনার পরও যুদ্ধজাহাজটির কোনো ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি এবং এতে কর্তব্যরত কোনো মার্কিন সেনাসদস্য হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হননি। ওই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি আঞ্চলিক জলসীমায় নিজেদের নির্ধারিত নিরাপত্তা ও টহল কার্যক্রম অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত রেখেছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের সেনাদের জীবনের ওপর যেকোনো হুমকিকে ওয়াশিংটন তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করবে এবং যেকোনো মূল্যে তার উপযুক্ত সামরিক জবাব নিশ্চিত করবে।
সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং পাল্টা ট্যাংকার ধ্বংসের ঘটনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন এক সর্বাত্মক প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে।
বিশেষ করে, সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ও তার পার্শ্ববর্তী জলসীমায় নিরাপত্তা সংকট চরম রূপ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিশ্বের মোট খনিজ তেল বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই সরু প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তি ইরানের মধ্যকার এই উন্মুক্ত সামরিক সংঘাত যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়ে আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তিকেই ধূলিসাৎ করবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।