শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামলার পঁচিশ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হুমকি বিদ্যমান, হিলারি ক্লিনটন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

হামলার পঁচিশ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হুমকি বিদ্যমান, হিলারি ক্লিনটন
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শোকাবহ দিন নাইন-ইলেভেন বা ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পঁচিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবে দীর্ঘ এই সময় পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর থেকে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি এখনো সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হয়নি বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিক হিলারি ক্লিনটন।

 

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন জাতীয় পর্যায়ে সন্ত্রাসী হুমকি শনাক্ত করা এবং তা কার্যকরভাবে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।

 

প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক আন্দ্রেয়া মিচেলের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে হিলারি ক্লিনটন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে সতর্কতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

 

তবে তিনি এটিও নিশ্চিত করেন যে, সাধারণ জনগণকে অহেতুক ভয় দেখানো বা পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা তার উদ্দেশ্য নয়। বরং তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান তৎপরতার দিকে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না।

 

২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার সময় নিউইয়র্কের সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হিলারি ক্লিনটন নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জানান, গত পঁচিশ বছরে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলার সুপরিকল্পিত ছক শেষ মুহূর্তে মার্কিন গোয়েন্দাদের তৎপরতায় ব্যর্থ হয়েছে, আবার কিছু পরিকল্পনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সফলও হয়েছে।

 

তার মতে, বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসের হুমকি চিরতরে শেষ হয়ে যায়নি; বরং তা কেবল কিছুটা স্তিমিত বা পিছিয়ে গেছে মাত্র। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনো হাজার হাজার উগ্রপন্থী ও চরমপন্থীর অস্তিত্ব রয়েছে, যারা যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি সাধনের জন্য সর্বদা প্রস্তুত।

 

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে হিলারি বলেন, জাতীয় স্বার্থে এই বিভাজন দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় এবং অরাষ্ট্রীয়—উভয় ধরনের হুমকিরই অত্যন্ত শক্তভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

 

একদিকে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিপক্ষগুলোকে যেমন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মতো অরাষ্ট্রীয় শক্তিকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

 

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের চেয়ে অন্যান্য বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

 

উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের ভেতরে বলরুম নির্মাণের মতো বিলাসবহুল পরিকল্পনার দিকে যতটা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন, আফগানিস্তান থেকে আসা অতি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে ততটা মনোযোগী নন।

 

হিলারির মতে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এ ধরনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ কোনোভাবেই যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। সাবেক এই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো, বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সক্ষমতা হ্রাস করেছে।

 

এর মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এমন কিছু ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকির নিখুঁত মূল্যায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

 

এই কাঠামোগত দুর্বলতার অনিবার্য ফলস্বরূপ, পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংবেদনশীল অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চোখ ও কান’ হিসেবে পরিচিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আগের মতো কার্যকর নেই।

 

সংবাদ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত বছর ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন 'ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি' উদ্যোগের অংশ হিসেবে ব্যয় সংকোচনের নামে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে হাজার হাজার পদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল।

 

এই ব্যাপক ছাঁটাই প্রক্রিয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এবং পররাষ্ট্র দপ্তরও রেহাই পায়নি। হিলারি ক্লিনটন স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, বিশেষ করে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে এখনো অসংখ্য অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ও দক্ষ কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন।

 

কিন্তু তার অভিযোগ, এই মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সুনির্দিষ্ট দায়িত্বকেন্দ্রিক কোনো সঠিক নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে না। এর ফলে তারা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য যে সক্ষমতা প্রয়োজন, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছেন।

 

অন্যদিকে, হিলারি ক্লিনটনের এই গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসি নিউজকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।

 

পরবর্তীতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একজন মুখপাত্র হিলারির দাবি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা বিবৃতিতে জানান, তাদের বিভাগটি যেকোনো পরিবর্তনশীল সন্ত্রাসী হুমকি সফলভাবে মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সক্ষম।

 

পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়া, কাঠামোগত সংস্কার এবং আধুনিকায়নের কাজ রেকর্ড গতিতে এগিয়ে চলছে বলেও তিনি দাবি করেন। সাক্ষাৎকারের শেষাংশে হিলারি ক্লিনটন নাইন-ইলেভেন হামলার পরবর্তী দিনগুলোতে নিউইয়র্ক শহরের বায়ুদূষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা আবেগঘন কণ্ঠে স্মরণ করেন।

 

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গ্রাউন্ড জিরোতে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেখানে কালো পর্দার মতো ঘন ধোঁয়া, বাতাসে ভাসমান বিষাক্ত কণিকা ও পোড়া ধ্বংসস্তূপের তীব্র গন্ধ বিরাজমান ছিল, যার কারণে তার নিজের গলাতেও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়েছিল।

 

হামলার পর ম্যানহাটনের বাতাসের মান সম্পর্কে তৎকালীন জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের দেওয়া তথ্যগুলো বিভ্রান্তিকর ছিল কি না-এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে হিলারি বলেন, ওই সময় ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞান, জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা এবং চরম সত্যের মুখোমুখি হতে প্রশাসনের অনীহা-এই তিনটি বিষয়ই মূলত কাজ করেছিল।

 

তিনি মনে করেন, তৎকালীন কিছু শীর্ষ নেতা হয়তো ইচ্ছে করেই সত্য পরিস্থিতিকে স্বীকার করতে চাননি, কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতি দ্রুত সচল রাখা, ওয়াল স্ট্রিটের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং বিশ্বকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসার একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া।

 

ফলে তারা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করেছিলেন, অথবা প্রয়োজনীয় ও অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরিশেষে, নাইন-ইলেভেন হামলাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জটিল অসুস্থতার কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে-প্রখ্যাত কমেডিয়ান ও নাইন-ইলেভেন স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী জন স্টুয়ার্টের এমন একটি পরিসংখ্যান নিয়ে হিলারি ক্লিনটন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, ওই ভয়াবহ হামলার কারণে যারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন অথচ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য সরকারের নির্ধারিত কর্মসূচিতে এখনো নিবন্ধিত হতে পারেননি, তাদের দ্রুত খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

 

এই উপেক্ষিত মানুষদের কাছে পৌঁছানো, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসার জন্য একটি সমন্বিত ও জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য শহর, অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে কাজ করার এবং অবিলম্বে পর্যাপ্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

- এনবিসি নিউজ