মহাকাশ দখলের এই আকস্মিক ও বিতর্কিত ঘোষণার পাশাপাশি তিনি নিজেকে একজন মহাশক্তিধর সুপারহিরো হিসেবেও জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে তার চিরাচরিত আক্রমণাত্মক ও জাতীয়তাবাদী প্রচারণার একটি নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদের ওই ছবি পোস্ট করার মাত্র কয়েক মিনিট আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক সামরিক শাখা 'স্পেস ফোর্স'-এর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা সম্পূর্ণ নতুন নকশার কালো রঙের ইউনিফর্মের ছবি শেয়ার করেন।
অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তিনি এই ইউনিফর্মের রঙের বর্ণনা দিতে গিয়ে সেগুলোকে স্পেস গ্রে, মিডনাইট ব্ল্যাক, সিলভার গ্রে এবং স্যাটিন ব্ল্যাক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অত্যাধুনিক ডিজাইনের এই সামরিক পোশাকগুলোতে কাঁধ ও কলারের বিশেষ ইনসিগনিয়া, হাতায় চমৎকার নকশার প্যাচ এবং আধুনিক বেল্ট যুক্ত করা হয়েছে, যা সামরিক আভিজাত্যের পরিচায়ক।
তবে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং সমালোচকরা ট্রাম্পের এই চাঁদের মালিকানার দাবি এবং নতুন সামরিক ইউনিফর্মকে জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন সিনেমা 'স্টার ওয়ার্স'-এর ইম্পেরিয়াল সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী রূপের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, মার্কিন প্রশাসনের এই আধিপত্যবাদ কেবল চাঁদে গিয়েই কেন থামবে, মঙ্গল গ্রহ বা সূর্যের দিকে কেন তারা যাত্রা করছে না! তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই একক ও আধিপত্যবাদী দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইন ও মহাকাশ বিষয়ক চুক্তি।
১৯৬৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'আউটার স্পেস ট্রিটি' বা আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের একশোরও বেশি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, পৃথিবীর বাইরের কোনো মহাজাগতিক বস্তু বা উপগ্রহের ওপর কোনো একক দেশ তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, ব্যবহার বা দখলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করতে পারবে না।
ফলে ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন মহাকাশ ও আইন বিশেষজ্ঞরা। মহাকাশ ছাড়াও পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ভৌগোলিক অবস্থানের নাম পরিবর্তন এবং মালিকানা দাবি করার এক অভূতপূর্ব ধারাবাহিকতা শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
একই ধারাবাহিক পোস্টে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকেও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড বলে দাবি করে বসেন। গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই তিনি অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে এই প্রণালিটির নাম পরিবর্তন করে 'ট্রাম্প স্ট্রেইট' রাখার একটি অভিনব প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
যদিও কয়েক ঘণ্টা পর তিনি নিজেই পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেন যে, অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বিষয়টি নিয়ে তিনি সম্ভবত খুব বেশি সিরিয়াস ছিলেন না। এরপর তিনি নজর দেন অভ্যন্তরীণ ভূগোলের দিকে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তন করে 'নিউ আমেরিকা' রাখার এক বিতর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
বিস্ময়করভাবে হোয়াইট হাউজও প্রেসিডেন্টের এই অদ্ভুত প্রস্তাবের পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে। তারা এমন একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ করে, যেখানে স্পষ্টভাবে 'মেক্সিকো' শব্দটি কেটে দিয়ে তার জায়গায় 'আমেরিকা' শব্দটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রস্তাবের তীব্র ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিশেল লুজান গ্রিশাম। গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পের প্রস্তাবের কড়া জবাব দিয়ে বলেন, একটি অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তন কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলটি তাদের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে আসছে। গভর্নরের দাবি, দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো চরম সংকটজনক ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো থেকে সাধারণ আমেরিকানদের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে সরিয়ে দিতেই ট্রাম্প সুকৌশলে এ ধরনের মনগড়া ও ভিত্তিহীন প্রস্তাব দিচ্ছেন।
নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তনের এই আকস্মিক প্রস্তাবের আগে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একটি নাম পরিবর্তনের বিতর্কিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক দিন আগে প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চরম বিরোধ ও উত্তেজনার মধ্যেই তিনি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে 'লেক আমেরিকা' রাখার একটি সরকারি নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন।
গত ২৭ আগস্ট ওভাল অফিস থেকে তিনি অত্যন্ত ঘটা করে এই ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, লেক অন্টারিও হলো কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের পাঁচটি গ্রেট লেকের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়। কানাডার অন্টারিও প্রদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে এর নামের গভীর ঐতিহাসিক মিল রয়েছে এবং এই হ্রদটির উত্তর-পশ্চিম তীরেই অবস্থিত কানাডার বিখ্যাত শহর টরন্টো।
লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের এই একতরফা মার্কিন উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন কানাডার হুরন-ওয়েন্ডাট ফার্স্ট নেশনের গ্র্যান্ড চিফ পিয়েরে পিকার্ড। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত জঘন্য ও অকথ্য একটি কাজ বলে কঠোর মন্তব্য করেন এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত চেষ্টা করার গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
পাশাপাশি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা ও আগ্রাসী সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ও জোরালো বিরোধিতা করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালে পুনরায় হোয়াইট হাউজে ফেরার প্রথম দিনেই ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে 'গালফ অব আমেরিকা' রাখার এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মেক্সিকো সরকার তৎক্ষণাৎ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল। ঠিক একইভাবে কানাডাও এবার লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের মার্কিন উদ্যোগকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনীতিতে এমন একের পর এক চরম বিতর্কিত ও আধিপত্যবাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঠিক একই সময়ে ট্রাম্প নিজেকে একজন মহাশক্তিধর অতিমানব হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায় মেতেছেন।
হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্মিত ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিখ্যাত কমিক সুপারহিরো 'গ্রিন ল্যান্টার্ন' রূপে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই ভিডিওর পাশাপাশি দুটি ছবিও পোস্ট করা হয়, যার একটিতে দেখা যায় তিনি এক হাতে সবুজ রঙের উজ্জ্বল শক্তির আংটি বা পাওয়ার রিং পরে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছেন।