তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি খাতে অযাচিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি আরোপ করা হলে তা বিশ্বমঞ্চে আধুনিক প্রযুক্তির দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক পেছনে ফেলে দেবে এবং এই পরিস্থিতির সরাসরি ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র চীন।
প্রায়শই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন নিখুঁত অথচ বিতর্কিত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আলোচনায় থাকা এই প্রেসিডেন্ট প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ন্ত্রণের দাবিরও অত্যন্ত কঠোর ও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করছে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মার্কিন প্রযুক্তি নীতিতে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। গত সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসময় পুরো বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে মানবজাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে বলে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা মূলত একটি বিশাল ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদীদের যে জোরালো সতর্কবার্তা রয়েছে, তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আশঙ্কাকে সরাসরি তুলনা করে তিনি একে একটি ‘অসুস্থ ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ট্রাম্পের মতে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো সম্ভাবনাময় একটি খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন করে কোনো ধরনের বাড়তি আইনি বিধিনিষেধ বা সরকারি হস্তক্ষেপের একেবারেই কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, এই আধুনিক প্রযুক্তির একমাত্র নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষাকবচ হতে পারেন একজন অত্যন্ত শক্তিশালী, দূরদর্শী ও উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রেসিডেন্ট, যা বর্তমানে আমেরিকার রয়েছে বলে তিনি নিজেকেই ইঙ্গিত করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আক্রমণাত্মক মন্তব্য ঠিক এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অত্যন্ত দ্রুত, অনিয়ন্ত্রিত ও অভাবনীয় উন্নয়নের লাগাম টানার জন্য বিশ্বজুড়ে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন স্বয়ং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরাই।
অন্যতম শীর্ষ এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সম্প্রতি এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরির দাবি তোলেন। তাঁর এই সময়োপযোগী ও যৌক্তিক আহ্বানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ একমত পোষণ করেছেন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এবং জনপ্রিয় চ্যাটবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রভাবশালী প্রযুক্তিবিদেরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শীর্ষ প্রযুক্তিবিদদের আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তার পরপরই বৈশ্বিক বাজারে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বৃহৎ শেয়ারবাজারগুলোতে এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পতন লক্ষ করা গেছে।
প্রযুক্তি খাতের এই প্রধান নির্বাহীরা নিজেরাই যখন নিজেদের শিল্পের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন, তখন তাদের এমন ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তাঁর মতে, আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কোনো নজির বা উদাহরণ নেই যেখানে কোনো শিল্পের শীর্ষ কর্তারা স্বেচ্ছায় এমন কোনো কঠোর সরকারি নিয়ম বা বিধিনিষেধ আরোপের জন্য সরকারের কাছে ধরনা দেন, যা তাদের নিজেদেরই ব্যবসায়িকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্প মনে করেন, প্রযুক্তিবিদদের এই ধরনের দাবি মার্কিন উদ্ভাবনী শক্তিকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তাঁর বর্তমান প্রশাসন ইতোমধ্যেই অ্যানথ্রপিকের মতো প্রথম সারির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে তাদের গবেষণার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বা ধ্বংসাত্মক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে অত্যন্ত সফলভাবে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে, প্রযুক্তি খাতে নতুন আইনি নিয়ন্ত্রণের আভাস এবং এআই প্রযুক্তির সম্প্রসারণের গতি আগামীতে কমে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কায় আমেরিকার শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যে একটি ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে নানামুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় এআই প্রযুক্তির কারণে বিভিন্ন পেশায় ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান হারানো, দেশজুড়ে নতুন নতুন বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং সর্বোপরি শিশুদের প্রথাগত পড়াশোনা ও সুস্থ মানসিক বিকাশে এই আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং এর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মার্কিন রাজনীতির ও আসন্ন নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।