শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ফরেন পলিসির প্রতিবেদন

ইরানের বিরুদ্ধে বহুমুখী যুদ্ধে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে বহুমুখী যুদ্ধে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ওয়াশিংটনকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ হিসেবে ঘোষণা করে দাবি করেছিলেন যে, এখন কেবল মূল কাজটির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানা বাকি। তবে মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি তাদের এক বিস্তৃত বিশ্লেষণে জানিয়েছে, প্রায় সব কয়টি কৌশলগত মানদণ্ডেই যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সংঘাত সমাপ্তির কাছাকাছি এবং তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক রয়েছে। বরং সংঘাতটি গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথগুলো প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত কিছু কৌশলগত হামলা চালানো হলেও বৃহত্তর পরিসরে এই সামরিক অভিযান ওয়াশিংটনের জন্য একটি বিরাট কৌশলগত বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচিত করার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।

 

শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ করদাতাদের আনুমানিক আটত্রিশ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার এই যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও।

 

মার্কিন কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক রিপাবলিকান সদস্য বর্তমানে এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে নিজেদের মত দিচ্ছেন। এমনকি খোদ একজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা যুদ্ধ পরিচালনার ব্যর্থতার দায়ে বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে একটি অভিশংসন প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্যগুলো অর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল, তার প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলো পূরণে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

 

ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করা এবং তাদের মিত্র প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধের শুরুতে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, মার্কিন সামরিক অভিযান তেহরানের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।

 

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হওয়ার বদলে তাদের কার্যক্রমের পরিধি আরও কয়েক গুণ সম্প্রসারিত করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ বাহিনী সম্প্রতি লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর উল্লেখযোগ্য সামরিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।

 

তারা আল-মুখা বন্দরনগরী এবং মায়ুন দ্বীপের মতো অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সম্প্রতি সৌদি আরবের সাড়ে সাতশ মাইল দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে একটি সফল ড্রোন হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় চার শতাংশ আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

 

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে পেন্টাগনের পরিচালিত অভিযানও বর্তমানে থমকে গেছে। গত এপ্রিল মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার্যত সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

 

তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত সম্পদগুলোর ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, তেহরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যকর সামরিক সক্ষমতা মজুত রয়েছে।

 

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ইরান গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে নতুন করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে, যা আকাশ থেকে পরিচালিত যেকোনো বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই সুরক্ষিত ও অভেদ্য।

 

তুলনামূলক কম খরচের উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করায় দীর্ঘমেয়াদে তাদের বাধা দেওয়ার পশ্চিমা কার্যক্রম অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিষয়ে ওয়াশিংটনের যে প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, সেটিও মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনেয়ীর শাহাদাতের মতো বিশাল আঘাতের পরও দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং তারা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আরও বেশি কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে।

 

পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউস প্রথম দিকে দাবি করেছিল যে তারা সফলভাবে ইরানের সকল পরমাণু স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রশাসন ধীরে ধীরে এই বিষয়টি থেকে নিজেদের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে।

 

এর পরিবর্তে তারা বর্তমানে নৌ অবরোধ এবং ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে পরিচিত একটি সর্বাত্মক আর্থিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কঠোর উদ্যোগকে ইরানের প্রতিটি অর্থনৈতিক জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তেহরানের সফলভাবে টিকে থাকার যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তা বিবেচনা করলে কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে তাদের কূটনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

 

সব মিলিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একটি ক্ষয়িষ্ণু এবং ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ওই অঞ্চলে সমুদ্রপথে পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি অশনিসংকেত।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি একশ চার ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যেখানে এই সংঘাত শুরুর আগে এর দাম ছিল মাত্র বাহাত্তর ডলার। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।

 

এর পরিণতি হিসেবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং জনঅসন্তোষ ক্রমেই আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। যুদ্ধ যখন অষ্টম মাসের দিকে গড়াচ্ছে, তখন হোয়াইট হাউসের ওপর বহুমুখী চাপ এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতার জাল ক্রমশ আরও বেশি আঁটসাঁট হচ্ছে।

 

- পার্সটুডে