বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন কংগ্রেসে ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ পাস, চরম শুল্কের মুখে ভারতসহ ১০ দেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ এএম

মার্কিন কংগ্রেসে ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ পাস, চরম শুল্কের মুখে ভারতসহ ১০ দেশ
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক যুগান্তকারী এবং যুগপৎ উদ্বেগজনক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদে বহুল আলোচিত ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল চূড়ান্তভাবে পাস হয়েছে।

 

এই বিলটি সম্পূর্ণরূপে আইনে পরিণত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিশাল এবং অত্যন্ত লাভজনক বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে ভারত ও চীনসহ বিশ্বের দশটি প্রভাবশালী ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই বিলের আওতায় উল্লেখিত দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি শুল্ক আরোপের যে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও সাপ্লাই চেইনে একটি সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

 

বৈশ্বিক বাণিজ্যের দুই পরাশক্তি ভারত ও চীন ছাড়াও এই ভয়াবহ শুল্ক জরিমানার চরম ঝুঁকিতে থাকা অন্য আটটি দেশ হলো ইউরোপের হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া, ইউরেশিয়ার আজারবাইজান, তুরস্ক, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান এবং এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুর।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং স্বনামধন্য ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক বিস্তারিত ও যৌথ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উপস্থিত আইনপ্রণেতাদের চূড়ান্ত ভোটাভুটির জন্য বিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়, যা মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

 

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষটির মোট চারশো পঁয়ত্রিশ জন জনপ্রতিনিধির মধ্যে চারশো একুশ জন সদস্য এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিলটির ওপর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। অধিবেশন কক্ষে তুমুল তর্ক-বিতর্ক, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ভোটাভুটির চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, বিলটি পাসের পক্ষে নিজেদের সুস্পষ্ট ও জোরালো সমর্থন জানিয়ে ভোট দিয়েছেন দুইশো বাষট্টি জন আইনপ্রণেতা।

 

অন্যদিকে, বিলটির কঠোর শর্তাবলি মার্কিন অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন একশো ঊনষাট জন সদস্য। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিলটি নিম্নকক্ষে সফলভাবে পাস হয়।

 

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এই একই বিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়েছিল। বুধবার নিম্নকক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এখন এই বিলটি কেবল একটি মাত্র ধাপ দূরে রয়েছে। এটি এখন চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসে পাঠানো হবে।

 

সেখানে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিলটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করামাত্রই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও আইনিভাবে কার্যকর মার্কিন আইনে পরিণত হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

 

এই কঠোর ও নজিরবিহীন ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ বিলটির অন্তর্নিহিত মূল বক্তব্য ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গভীর এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে পরিপূর্ণ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনের স্বাধীন ভূখণ্ডে রুশ সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক আগ্রাসন ও সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পরপরই রাশিয়ার অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করার লক্ষ্যে দেশটির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপক মাত্রায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো।

 

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মূল ও প্রধান অভিযোগ হলো, পশ্চিমা বিশ্বের সেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যে সমস্ত দেশ নিজেদের সাময়িক অর্থনৈতিক স্বার্থে নিয়মিতভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল ক্রয় করে চলেছে, তারা মূলত পরোক্ষভাবে এই ধ্বংসাত্মক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখছে।

 

এই বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রির অর্থ দিয়ে রাশিয়া নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আরও সুসজ্জিত ও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে বলে ওয়াশিংটন মনে করে। ঠিক এই কারণেই, যেসব দেশ আন্তর্জাতিক চাপ অগ্রাহ্য করে নিয়মিতভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল ক্রয় করে আসছে, তাদের জন্য একটি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সেইসব দেশের রপ্তানিকৃত পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মার্কিন প্রশাসনের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে এই বিলের মাধ্যমে।

 

এর ফলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর শত শত বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এই যুগান্তকারী বিলটির প্রেক্ষাপট রচনা এবং তা মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ও বর্ষীয়ান প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।

 

তিনি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র এবং ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়ার প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে এবং মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে আসছিলেন।

 

তারই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গত ৭ আগস্ট মার্কিন সিনেটে তার প্রস্তাবিত এই ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ বিলটি প্রথমবারের মতো সফলভাবে পাস হয়। তবে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক বিষয় হলো, তার এই রাজনৈতিক বিজয়ের মাত্র চার দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রবীণ মার্কিন সিনেটর।

 

লিন্ডসে গ্রাহামের অকাল মৃত্যুর পরও তার সযত্নে প্রস্তাবিত বিলটি নিম্নকক্ষে পাস হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বিষয়টি আবারও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।

 

এখন পুরো বিশ্বের নজর হোয়াইট হাউসের দিকে নিবদ্ধ, কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি মাত্র স্বাক্ষরই বদলে দিতে পারে আগামীর বিশ্ববাণিজ্যের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি এবং নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কৌশলগত সমীকরণ।

 

- এপি, দ্য হিন্দু