আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই হাই-প্রোফাইল সফরটিকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে, কারণ এই সাক্ষাতে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারকরণ, প্রযুক্তিগত খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক বাণিজ্য শুল্ক হ্রাসের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্যসূচিতে স্থান পাবে বলে মার্কিন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
এই সফরটি কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কূটনৈতিক প্রথা ও রীতির বাইরে গিয়ে এই সফরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হতে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বুধবার ওয়াশিংটনের ঠিক বাইরে অবস্থিত জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে যখন চীনের প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানটি অবতরণ করবে, তখন সেখানে তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকবেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সাধারণত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে সরাসরি হোয়াইট হাউসেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রেওয়াজ যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত রয়েছে। তবে শি জিনপিংয়ের এই বিশেষ সফরের ক্ষেত্রে সেই প্রথা ভেঙে ট্রাম্প একটি ব্যতিক্রমী ও উষ্ণ অভ্যর্থনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা এবং অত্যন্ত নিবিড় কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু হবে এর পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের মর্যাদাপূর্ণ ‘স্টেট ফ্লোর’-এ চীনা প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রী পেং লিউয়েনকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানাবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
এরপর হোয়াইট হাউসের বিখ্যাত রোজ গার্ডেনে একটি মনোজ্ঞ সামরিক গার্ড অব অনার পরিদর্শনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। এই পর্ব শেষে বিশ্বের এই দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসবেন, যেখানে তাদের মধ্যে বৈশ্বিক নানা সংকট ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হবে।
নেতারা যখন এই সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংলাপে ব্যস্ত থাকবেন, ঠিক সেই সময়ে দুই দেশের ফার্স্ট লেডিরা সম্পূর্ণ পৃথক একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন।
এই ঐতিহাসিক সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের জমকালো ‘ইস্ট রুম’-এ চীনা প্রতিনিধিদলের সম্মানে একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এই নৈশভোজের গুরুত্ব অপরিসীম।
এই মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বরা। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, টেসলার প্রধান ইলোন মাস্ক, গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই, অ্যাপলের সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাহী টিম কুক, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, সিটিগ্রুপের জেন ফ্রেজার এবং ডেল টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেলের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই নৈশভোজে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসে নির্মাণাধীন নতুন বলরুমের কাজ এখনো শেষ না হওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই এই আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা কিছুটা সীমিত রাখতে হয়েছে।
সফরের শেষ দিনে অর্থাৎ শুক্রবার শি জিনপিং ও পেং লিউয়েন হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দম্পতির সাথে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এক ব্যক্তিগত চা-চক্রে অংশ নেবেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ বছর বা ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে চীনা প্রেসিডেন্টকে মার্কিন ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস’ পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া হবে।
এই ঐতিহাসিক স্থানে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাকালীন এবং অত্যন্ত মূল্যবান দলিলপত্র সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। দুই দেশের নেতাদের মধ্যকার এই সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিনিময় শেষে চীনের প্রেসিডেন্ট তার বিশাল প্রতিনিধিদল নিয়ে স্বদেশের রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন ত্যাগ করবেন।
রাষ্ট্রপ্রধানদের এই শীর্ষ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরের পাশাপাশি দুই দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কর্মকর্তারাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সংলাপে বসতে যাচ্ছেন। জানা গেছে, নিউইয়র্কে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেংয়ের সঙ্গে একটি গভীর ও নিবিড় বৈঠকে মিলিত হবেন।
এই উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও স্মার্টফোন তৈরিতে ব্যবহৃত ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল মৃত্তিকা ধাতুর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে বিস্তারিত কথা হবে।
একই সঙ্গে, কৌশলগত নয় এমন বেশ কিছু সাধারণ পণ্যের ওপর থেকে পারস্পরিক শুল্ক কমানোর বিষয়েও উভয় পক্ষ একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে বলে কূটনৈতিক মহল থেকে জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ওয়াশিংটন তাদের বর্তমান রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি খুব একটা শিথিল করবে, এমন সম্ভাবনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নাকচ করে দিয়েছেন।
বাণিজ্য ও অর্থনীতির এই অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোচনায় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শাসনামলে এবং গত মে মাসে চীন সফর করেছিলেন, যেখানে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তাকে অত্যন্ত উষ্ণ লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, চীনের কোনো শীর্ষ নেতার জন্য এটি গত এক দশকের মধ্যে প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রীয় সফর। এর আগে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে শেষবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে একটি পূর্ণাঙ্গ সফর করেছিলেন শি জিনপিং।