রবিবার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই তথ্য প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার জন্য হুথিদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কালো মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য বৈশ্বিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রেই ইংস্টকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই গোষ্ঠীটি নিশ্চিত করেছে যে তারা কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়াবে না। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর সরাসরি আক্রমণ চালানো থেকে হুথিরা নিজেদের সতর্কভাবে গুটিয়ে রাখছে বলে অতীতেও বেশ কয়েকবার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ড সফরকালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের সামনে একই ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, হুথিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সামরিক সংঘাতে যেতে ইচ্ছুক নয়।
তাদের একমাত্র চাওয়া হলো, মার্কিন বাহিনী যেন তাদের লক্ষ্য করে কোনো বিমান হামলা বা সামরিক অভিযান পরিচালনা না করে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার সৌদি আরব হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।
শনিবারও সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যার ফলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একইসঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রেও আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের হাত থেকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে হুথিরা।
ফলে মিত্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আকাশসীমা যখন প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হুথিদের সঙ্গে এমন বোঝাপড়ার দাবি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ফক্স নিউজের ওই প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের নেপথ্যে থাকা ইরান ইস্যু নিয়েও ট্রাম্পের কৌশলগত অবস্থান বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ইরান বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বর্তমানে একটি চূড়ান্ত ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর বড় ধরনের হামলার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় সাত মাস ধরে এক তীব্র ও থমথমে মুখোমুখি অবস্থান বিরাজ করছে।
সাংবাদিক ট্রেই ইংস্টকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, একেবারে নিকট ভবিষ্যতেই এই অঞ্চলে অভাবনীয় ‘বড় কিছু’ ঘটতে চলেছে। সাক্ষাৎকারে তেহরানের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ইরানিদের অবিলম্বে নিজেদের আচরণ সংযত করে দায়িত্বশীল সীমার মধ্যে ফিরে আসা উচিত।
তা না হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো দেশটিকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হবে কি না, তিনি এখন সেই চরম বিকল্পটি নিয়েই গভীরভাবে পর্যালোচনা করছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ক্ষেত্রে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করছে।
একদিকে তিনি আঞ্চলিক ভারসাম্য বিনষ্টকারী হুথিদের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলার কূটনৈতিক সমীকরণকে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে তাদের প্রধান মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক পদক্ষেপের চরম হুমকি দিচ্ছেন।
একইসঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের ওপর অব্যাহত হামলার মুখে ওয়াশিংটনের এই নির্লিপ্ততা ও সমঝোতামূলক মনোভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রাক্কালে মার্কিন প্রশাসনের এমন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে, নাকি নতুন কোনো সামরিক বিস্ফোরণের পথ উন্মুক্ত করবে, সেদিকেই এখন বিশ্ববাসীর সজাগ দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।