কেবল নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং মার্কিন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ‘এআই ফোর্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাহিনী নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিশেষ সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার ঐতিহাসিক ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে, দেশটির উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তি খাতের সার্বিক তদারকি, পরিচালনা এবং নীতি নির্ধারণের জন্য অতি শিগগিরই একজন ‘এআই জার’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রধান নিয়ন্ত্রক নিয়োগের কথাও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন।
গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া একগুচ্ছ ধারাবাহিক পোস্টে প্রযুক্তি বিশ্বকে চমকে দেওয়া এসব পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ের এই অত্যাধুনিক ও যুগান্তকারী প্রযুক্তির জন্য ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামটি পুরোপুরি যথার্থ বা মানানসই নয়। প্রযুক্তিটির অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ও ভবিষ্যতের বিপুল সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর একটি নতুন নামকরণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিষয়টি নিয়ে নিজের অনুসারী এবং সাধারণ মানুষের মতামত জানতে ট্রুথ সোশ্যালে একটি অনলাইন ভোটের বা পোলের আয়োজন করেন তিনি। সেখানে বিকল্প হিসেবে তিনি তিনটি নতুন এবং অত্যন্ত জোরালো নামের প্রস্তাব রেখেছেন।
নামগুলো হলো- ‘সুপিরিয়র ইন্টেলিজেন্স’ বা উৎকৃষ্ট বুদ্ধিমত্তা, ‘এক্সট্রিম ইন্টেলিজেন্স’ বা চরম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘সুপ্রিম ইন্টেলিজেন্স’ বা সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা। নামকরণের প্রস্তাব দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই অপর একটি পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন যে, একটি নির্দিষ্ট মহল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতকে ধ্বংস বা দুর্বল করার জন্য সুকৌশলে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই পুরো বিষয়টিকে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটদের অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ‘হোক্স’ বা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রচারণার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিবিষয়ক স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ তাদের এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এই গুরুতর দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করেননি।
বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের প্রসার ও এর জন্য প্রয়োজনীয় সুবিশাল তথ্যকেন্দ্র বা ডাটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশ বিতর্ক রয়েছে। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান-উভয় রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার মধ্যেই এই বিষয়ে সমালোচনা ও মতবিরোধ বিদ্যমান।
এমনকি, এই বিশাল ডাটা সেন্টারগুলো পরিচালনার জন্য মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের কারণে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য সম্প্রতি তাদের অঞ্চলে নতুন করে বড় পরিসরের কোনো ডাটা সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে, যা মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে কিছু নিরাপত্তাবিধি বা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বললেও, বর্তমানে তার সেই অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন তিনি এই প্রযুক্তিটির নেতিবাচক দিক নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের যৌক্তিকতা নিয়ে উল্টো প্রশ্ন তুলছেন।
শনিবারের ওই ঘোষণায় তিনি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এর বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার প্রথম মেয়াদের শাসনামলে মার্কিন মহাকাশ সুরক্ষার জন্য যেভাবে ‘স্পেস ফোর্স’ গঠন করা হয়েছিল, ঠিক সেই একই আদলে ও কাঠামোতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষার জন্য নতুন এই ‘এআই ফোর্স’ গঠন করা হবে।
এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে সমন্বয় করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য একজন ক্ষমতাধর ‘এআই জার’ নিয়োগের কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রস্তাবিত এই ‘এআই ফোর্স’ ঠিক কীভাবে কাজ করবে এবং ‘এআই জার’-এর সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতা, সাংগঠনিক দায়িত্ব বা কাজের পরিধি ঠিক কতটুকু হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ডেভিড স্যাকস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি বিষয়ক নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে তিনি সেই পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সহসভাপতির মতো গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ডেভিড স্যাকসের এই পদত্যাগের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত দেখভালের শীর্ষ পদটি কার্যত ফাঁকাই ছিল। এখন নতুন ঘোষিত এই এআই কাঠামো ও এআই ফোর্সের নেতৃত্ব কার কাঁধে বর্তাবে এবং কীভাবে এটি পরিচালিত হয়ে মার্কিন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, সেদিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে গোটা প্রযুক্তি বিশ্ব।