মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মামদানির তোপে জাতিসংঘে সফরসূচি কাটছাঁট করলেন নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

মামদানির তোপে জাতিসংঘে সফরসূচি কাটছাঁট করলেন নেতানিয়াহু
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বৃহৎ মঞ্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তার এবারের এই সফরটি অতীতের যেকোনো রাষ্ট্রীয় সফরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চরম মাত্রায় সংকুচিত।

 

মূলত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে, বিশেষ করে নিউইয়র্ক শহরে ব্যাপক ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের প্রবল আশঙ্কা এবং স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি তার এই পূর্বনির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ সফরসূচিকে অভাবনীয়ভাবে সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হয়েছেন।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তিনি বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পৌঁছাবেন, সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তার নির্ধারিত ভাষণ প্রদান করবেন এবং কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে সেদিনই পুনরায় ইসরায়েলের পথে রওনা হবেন।

 

একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এ ধরনের তড়িঘড়ি করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সফরের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির একটি অত্যন্ত কড়া, সরাসরি এবং প্রকাশ্য আক্রমণাত্মক মন্তব্য।

 

মেয়র মামদানি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু তাই নয়, গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বেসামরিক প্রাণহানির প্রেক্ষাপট টেনে তিনি নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের ওপর চালানো ‘ভয়াবহ গণহত্যার প্রধান স্থপতি’ বলেও চরমভাবে ভর্ৎসনা করেছেন।

 

স্বাগতিক শহরের নির্বাচিত শীর্ষ জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে এমন প্রকাশ্য ও তীব্র বিরোধিতাপূর্ণ মন্তব্যের পর ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নেতানিয়াহুর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গভীর হিসাব-নিকাশ করতে বাধ্য হয়েছে।

 

এই চরম বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ ও সম্ভাব্য বিশাল গণবিক্ষোভের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতেই সফরটি কাটছাঁট করাকে সবচেয়ে নিরাপদ ও যুক্তিসঙ্গত কৌশল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

 

নিরাপত্তা শঙ্কা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার এই দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অবতরণ স্থলের নির্ধারণের ক্ষেত্রেও। সাধারণত রাষ্ট্রনেতারা যখন জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে আসেন, তখন তারা নিউইয়র্কের প্রখ্যাত জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে থাকেন।

 

তবে এবার নিরাপত্তার কঠোর বলয় তৈরি করতে নেতানিয়াহুর রাষ্ট্রীয় বিমান ‘উইং অব জিওন’-এর অবতরণের স্থান পরিবর্তন করা হতে পারে। জানা গেছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রটোকল সমন্বয় সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এবং মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিমানটি নিউ জার্সির একটি সুরক্ষিত সামরিক বিমানঘাঁটিতে অথবা তুলনামূলক নিরাপদ এলাকা হিসেবে পরিচিত নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে।

 

যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, বিক্ষোভকারীদের অবরোধ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এড়াতেই এমন নজিরবিহীন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত ও চূড়ান্ত কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বুধবার রাতে ইসরায়েল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে উড়াল দেবেন।

 

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটায় (যা ইসরায়েলের স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত নয়টা) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তিনি তার বহুল কাঙ্ক্ষিত ভাষণ প্রদান করবেন। ইসরায়েলি প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার এবারের ভাষণে প্রধানত ইরানের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক হুমকি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

 

পাশাপাশি, ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চমকে দেওয়ার মতো কিছু বিশেষ ‘চমকপ্রদ’ ও নতুন কৌশলগত সামরিক ও কূটনৈতিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অতি সংক্ষিপ্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিউইয়র্কের কোনো হোটেলে রাত্রিযাপন করবেন না।

 

বৃহস্পতিবার বিকেলে তার আনুষ্ঠানিক ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই, সন্ধ্যার দিকে তিনি স্বদেশের উদ্দেশে ফিরতি বিমানে আরোহণ করবেন। এমনকি, নিরাপত্তার নজিরবিহীন কড়াকড়ি এবং সময়ের চরম সীমাবদ্ধতার কারণে এবার তার সঙ্গে নিজস্ব কোনো পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী বা সাংবাদিকের বহরও সফর করছে না, যা সাধারণত এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সফরে অত্যন্ত বিরল।

 

নেতানিয়াহুর এই সফরের প্রাথমিক পরিকল্পনায় আরও কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে একটি বিশেষ যাত্রাবিরতি এবং সেখানে প্রখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ধনকুবের ইলন মাস্কের সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎ।

 

কিন্তু সেটিও এখন আর আলোর মুখ দেখছে না। একজন দায়িত্বশীল ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত বৈঠকটি মূলত দুটি প্রধান কারণে বাতিল করা হয়েছে। প্রথমত, বিমানের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ এবং আনুষঙ্গিক কারিগরি বিরতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না।

 

দ্বিতীয়ত, একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে এ ধরনের একটি উচ্চপর্যায়ের আয়োজনের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দিক থেকে এক ধরনের দৃশ্যমান অনাগ্রহ, শীতলতা ও সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা গেছে।

 

নেতানিয়াহুর এবারের সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের সূচি নিয়েও চরম হতাশা ও এক ধরনের কূটনৈতিক শূন্যতা দেখা গেছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের সময় নির্ধারিত নেই।

 

তবে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তার একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও রুদ্ধদ্বার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে আগত বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও সাইডলাইনে বা অধিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে বৈঠকের জন্য ইসরায়েলি কূটনীতিকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তবে হাতে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মতো সময় থাকায় এবং নিরাপত্তার নজিরবিহীন কড়াকড়ির কারণে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোর আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।

 

একই সময়ে নিউইয়র্কের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহ চলছে, যা এই সফরের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি মঙ্গলবার শহরের সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বিশেষ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন, যা গণমাধ্যমের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত থাকছে না।

 

অন্যদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নিজের আনুষ্ঠানিক ভাষণ প্রদানের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি রাজধানী ওয়াশিংটনে ফিরে যাবেন এবং সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপ্রসারী দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন।

 

এর পাশাপাশি, এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরান, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো বিশ্বনেতাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

 

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ঠিক একই সময়ে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলকেও সাধারণ পরিষদের এই বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশের অনুমতি ও ভিসা প্রদান করেছে, যা কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশন কক্ষের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় তীব্র প্রতিবাদ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হট্টগোলের প্রবল আশঙ্কা করছে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল। গত বছরও তার ভাষণের সময় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের একাংশের তরফ থেকে একই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

 

এবারও গভীরভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, তিনি যখন বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়াবেন, তখন ফিলিস্তিনপন্থি বা মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা হয়তো সমস্বরে হট্টগোল করতে পারেন, নতুবা একটি সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা অধিবেশন কক্ষ থেকে একযোগে ওয়াকআউট বা বের হয়ে যেতে পারেন।

 

ইসরায়েলি শীর্ষ কূটনীতিকরা এই ধরনের যেকোনো চরম বিব্রতকর ও সম্মানহানিকর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আগে থেকেই মানসিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এর আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সশরীরে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা বহন করে। তিনি মূলত প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি অত্যন্ত নিবিড়, সুরক্ষিত ও সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্রীয় সফরে এই বৈশ্বিক মঞ্চে উপস্থিত থেকে নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।

 

- টাইমস অব ইসরাইল ও রয়টার্স