গত রোববার রাতে মার্কিন বিমান বাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো যখন তাদের নিজ নিজ ঘাঁটিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় ছিল এবং সেগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ভারী বোমা ও আধুনিক গোলাবরুদ বোঝাই করা সম্পন্ন হয়েছিল, ঠিক সেই চরম ও টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি নির্দেশ আসে সম্পূর্ণ অভিযানটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই চরম নাটকীয় ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা আন্তর্জাতিক সামরিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির ও অত্যন্ত প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর একটি বিস্তৃত এবং অত্যন্ত গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর সামরিক ও কূটনৈতিক তথ্যটি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।
সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনটিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশেষ ও অত্যন্ত জরুরি অনুরোধের প্রেক্ষিতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠীটির ওপর এই কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রাথমিক নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
সেই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নির্দেশের ভিত্তিতেই রোববারের ওই নিবিড় ও সর্বাত্মক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল মার্কিন বিমান বাহিনী। কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এবং যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য মিত্রদের, বিশেষ করে রিয়াদকে এক ধরনের গভীর অস্বস্তিকর ও চিন্তিত বার্তা দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে এক ধরনের ব্যাপক আলোড়ন ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য ও শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স এই ঘটনার আরও গভীরে যাওয়ার জন্য এবং খবরের প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টার বা সেন্টকমের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে।
তবে সেন্টকমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই চরম সংবেদনশীল সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে গণমাধ্যমের সামনে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানান। তারা সাংবাদিকদের এই বিষয়ে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরের জন্য সরাসরি হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ দপ্তরে কথা বলার পরামর্শ প্রদান করেন।
পরবর্তীতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মার্কিন প্রশাসনের কেউই এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বদলের নেপথ্যের কারণ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিন্দুমাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা এই ঘটনার চারপাশের রহস্যময়তাকে আরও বহুগুণে ঘনীভূত করেছে।
এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কেবল ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সুরক্ষিত দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ইয়েমেনের রণাঙ্গন পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইয়েমেনের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চপদস্থ অন্তত চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং সৌদি আরবের পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকারের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাশিদ আল-আলিমি মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পর গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা রুখতে তিনি আজ সোমবার সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে টেলিফোন করেন। দীর্ঘ টেলিফোন আলাপে তিনি হুথিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন রুখতে মার্কিন বিমান হামলার জন্য পুনরায় অত্যন্ত জোরালো ও আবেগময় ভাষায় অনুরোধ জানান।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অনুরোধও সরাসরি এবং স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রেসিডেন্টের এই অনড় অবস্থান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে যে, মার্কিন প্রশাসন এই মুহূর্তে ইয়েমেনের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নতুন করে সরাসরি সামরিকভাবে জড়াতে সম্পূর্ণভাবে নারাজ।
সাম্প্রতিক এই তীব্র সামরিক উত্তেজনার মূল সূত্রপাত ঘটে চলতি মাসের শুরুর দিকে। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইয়েমেনের মাটি কামড়ে থাকা হুথি বিদ্রোহীদের এক নতুন মাত্রার অত্যন্ত ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়, যা সীমান্ত পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তোলে।
এর মাত্র দুই দিন পর, অর্থাৎ গত ১০ সেপ্টেম্বর, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং হুথিদের সামরিক সক্ষমতা চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সরাসরি সামরিক বিমান হামলার সহায়তা প্রার্থনা করেছিলেন।
কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে সেই সময়েও মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্র দেশ সৌদি আরবের সেই জরুরি সামরিক অনুরোধ অত্যন্ত কৌশলে ও সবিনয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রিয়াদের নীতি-নির্ধারকদের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা প্রদান করেন।
তারা সৌদি সরকারকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মুহূর্তে ইয়েমেনের প্রক্সি যুদ্ধের চেয়ে ইরান এবং কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের প্রভাব ও নিরঙ্কুশ কব্জামুক্ত করার প্রতি তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবদ্ধ করতে চাইছেন।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত স্পর্ষকাতর ও জীবনরেখাস্বরূপ সামুদ্রিক পথ, যার ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের চাহিদার একটি বিশাল অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়ে থাকে।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ইয়েমেনের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী, জটিল এবং মানবিক বিপর্যয়ে জর্জরিত গৃহযুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে তা কেবল মার্কিন সামরিক ও বিপুল আর্থিক সম্পদকেই অযথা ক্ষয় করবে না, বরং তাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগকে সম্পূর্ণ অন্যদিকে সরিয়ে দেবে।
তাই তেহরানের সমর্থনপুষ্ট একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রক্সি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে মার্কিন প্রশাসন চাইছে তাদের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ইরানের মূল শক্তির জায়গাতেই সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন চাপ প্রয়োগ করতে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো অঞ্চলে নতুন করে সামরিক ফ্রন্ট খুলে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করার ব্যাপারটি ওয়াশিংটন অত্যন্ত সচেতন ও সুপরিকল্পিতভাবেই এড়িয়ে চলার এক নতুন কৌশলগত নীতি গ্রহণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই সম্পূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের রাজনৈতিক সমীকরণ আরও পরিষ্কার ও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক প্রকাশ্য মন্তব্যের মাধ্যমে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে থাকাকালীন হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আপাতত কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার একটি অত্যন্ত জোরালো ও প্রকাশ্য ইঙ্গিত তিনি বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে প্রদান করেছিলেন।
সেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সরাসরি এক প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
তার প্রকাশ্য ভাষ্যমতে, হুথিরা ওয়াশিংটনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আশ্বস্ত করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতে জড়াতে বা দীর্ঘমেয়াদি লড়াই করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয়।
হুথিদের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, তারা চায় ওয়াশিংটন যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার সামরিক বা শাস্তিমূলক ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই একেবারে শেষ মুহূর্তের আকস্মিক সিদ্ধান্ত বাতিল এবং সরাসরি হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে প্রকাশ্যে আনার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সন্দেহাতীতভাবেই এক নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে।
পরম মিত্র দেশ সৌদি আরবের সরাসরি ও বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও এবং নিজেদের সর্বাত্মক সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরও হামলা থেকে সরে আসার এই অভূতপূর্ব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এখন থেকে কেবল তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও বৃহত্তর বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই যেকোনো সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, ইরান-সৌদি আরবের মধ্যকার চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের চিরস্থায়ী ভূ-কৌশলগত অবস্থান-এই সবকিছুর সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী বার্তা বহন করে।
একদিকে যেমন এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য বৃহৎ মাত্রার সামরিক উত্তেজনা ও প্রাণহানিকে আপাতত প্রশমিত করেছে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আরব মিত্রদের মনে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে এক ধরনের নতুন হিসাব-নিকাশ করতেও বাধ্য করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন অত্যন্ত গভীর আগ্রহ ও নিবিড় দৃষ্টির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধ এড়ানোর কূটনীতি এবং ইরানের দিকে নিজেদের সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করার এই নতুন নীতি আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতায় ঠিক কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।