সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওয়াশিংটনের বুকে অত্যাধুনিক সামরিক স্থাপনা নির্মাণের বিতর্কিত রূপরেখা

মো. নাঈম ইসলাম শান্ত

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

ওয়াশিংটনের বুকে অত্যাধুনিক সামরিক স্থাপনা নির্মাণের বিতর্কিত রূপরেখা
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ঐতিহাসিক ও নান্দনিক দৃশ্যপটে এক বিশাল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা একটি সুবিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ বিজয় তোরণকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাজনৈতিক, সামরিক ও স্থাপত্য অঙ্গনে এক নতুন এবং ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রস্তাবিত এই বিজয় তোরণটি নিছক কোনো সাধারণ স্থাপত্য বা স্মারক হিসেবে গড়ে তোলা হবে না, বরং এটিকে একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অত্যাধুনিক সামরিক কমপ্লেক্স বা সামরিক স্থাপনা হিসেবে রূপ দেওয়া হবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একটি ঐতিহ্যবাহী বিজয় তোরণকে কীভাবে দূরপাল্লার বন্দুকধারী বা স্নাইপারদের গোপন আস্তানা এবং সামরিক সরঞ্জামের মজুতখানায় পরিণত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই তীব্র সমালোচনা ও গভীর উদ্বেগের জন্ম হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা এই উদ্যোগকে মার্কিন রাজধানীর চিরাচরিত গণতান্ত্রিক ও উন্মুক্ত পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন। রোববার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিস্তারিত পোস্টে এই প্রকল্পের অভিনব রূপরেখা সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করেন।

 

সেখানে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ অনুরোধের ভিত্তিতেই এই বিজয় তোরণের মূল নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত এই নতুন নকশা অনুযায়ী, প্রায় আড়াইশ ফুট উঁচু এই সুবিশাল স্থাপনার ছাদ ও উন্মুক্ত চত্বরকে এমনভাবে সাজানো হবে, যেখানে মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন ওঠানামা করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

 

একই সঙ্গে, সেখানে দূরপাল্লার বন্দুকধারীদের জন্য বিশেষ স্নাইপার সুবিধা এবং বিপুল পরিমাণ স্নাইপার গোলাবারুদ সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত গোপন প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করা হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর এই ঘোষণায় দাবি করেন যে, জরুরি সামরিক পরিস্থিতিতে অতি দ্রুত এসব সমরাস্ত্র ব্যবহারের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে এবং বিশ্বের আর কোনো দেশের রাজধানীতে এমন অভিনব ও যুগান্তকারী সামরিক স্থাপনার অস্তিত্ব নেই।

 

এই ঘোষণাই মূলত বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। প্রস্তাবিত এই বিজয় তোরণের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে স্থাপত্যবিদ এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেমোরিয়াল ব্রিজের কাছাকাছি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় এই বিশাল তোরণটি নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এই স্থানটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। তোরণটি যদি সত্যিই আড়াইশ ফুট উচ্চতা নিয়ে সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র স্থান আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেটারি এবং প্রখ্যাত লিংকন মেমোরিয়ালের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যমান সম্পর্ককে চিরতরে ব্যাহত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

ওয়াশিংটনের এই এলাকাটি মূলত তার শান্ত, সমাহিত এবং ঐতিহাসিক ভাবগাম্ভীর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সেখানে একটি আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত ও সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহারযোগ্য স্থাপনা গড়ে উঠলে তা আশপাশের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধগুলোর দৃশ্যমান আবেদন এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে বলে সর্বমহলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ বা ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসও এই বিতর্কিত প্রকল্পটি নিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক আপত্তি ও গভীর উদ্বেগের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। উদ্যান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা নথিতে বলা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত এই বিশাল তোরণটি নির্মাণের ফলে ওই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য।

 

ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর অখণ্ডতা ও পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আরও অনেক বেশি বিশদ গবেষণা, সতর্ক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার কথা তারা জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

 

একটি সামরিক কমপ্লেক্সের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং সাধারণ পর্যটকদের অবাধ বিচরণের সুযোগ-এই দুই বিপরীতমুখী বিষয় একই স্থানে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে, সে বিষয়েও উদ্যান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রবল সংশয় প্রকাশ করেছে।

 

বিতর্কের এখানেই শেষ নয়; প্রস্তাবিত তোরণটির নির্ধারিত নির্মাণস্থান রোনাল্ড রিগ্যান ওয়াশিংটন ন্যাশনাল বিমানবন্দরের অত্যন্ত কাছাকাছি হওয়ায় এটি বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নতুন মাত্রার ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

 

ডেমোক্র্যাট দলের একাধিক প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্য ইতোমধ্যে রাজধানীর আকাশসীমার নিরাপত্তা ও বেসামরিক বিমান চলাচলের ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে প্রকাশ্যে তাঁদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

আড়াইশ ফুট উঁচু একটি স্থাপনা, যার ছাদে সামরিক ড্রোন এবং স্নাইপারদের অবস্থান থাকবে, তা যেকোনো সময় বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করতে পারে বলে উড্ডয়ন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন।

 

বেসামরিক বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় ছাড়া এমন একটি স্পর্শকাতর স্থানে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী সামরিক স্থাপত্য নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে এখন কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে জোর বিতর্ক চলছে।

 

এই মেগা প্রকল্পটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য, ঐতিহ্য সংরক্ষণবাদী সংগঠন এবং আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ ও আপত্তি লক্ষ করা গেছে। বেশ কয়েকজন ক্ষুব্ধ সাবেক সেনাসদস্য ইতোমধ্যে তোরণ নির্মাণের এই উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 

তাঁদের মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেটারির মতো একটি পবিত্র সমাধিস্থল, যেখানে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানেরা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন, তার ঠিক পাশেই একটি অহংকারী ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনকারী তোরণ নির্মাণ সেই শহীদদের প্রতি চরম অবমাননাকর হতে পারে।

 

তাঁরা মনে করেন, স্মৃতিসৌধের এলাকাটি কেবলই শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নীরব প্রার্থনার স্থান হওয়া উচিত, কোনো প্রকার সমরাস্ত্র প্রদর্শন বা সামরিক মহড়ার কেন্দ্র নয়। মূলত ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া একাধিক বড় ও উচ্চাভিলাষী নির্মাণ প্রকল্পের একটি হলো এই বিতর্কিত বিজয় তোরণ।

 

রাজধানীর স্থাপত্যগত সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের পরাক্রমশালী মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেই ট্রাম্প প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে এসব মেগা প্রকল্পের পক্ষে তাদের জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে।

 

এই বিজয় তোরণ ছাড়াও ট্রাম্পের অন্যান্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে হোয়াইট হাউসের ভেতরে একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল ও সুবিশাল বলরুম নির্মাণ, বিখ্যাত লিংকন মেমোরিয়ালের সামনের রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার এবং ঐতিহ্যবাহী কেনেডি সেন্টারের আধুনিকায়নের কাজ।

 

ট্রাম্পের ইচ্ছা, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণার আড়াইশতম বার্ষিকীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সমস্ত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হবে। তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিজয় তোরণটি মূলত অত্যন্ত দামি গ্রানাইট পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হবে এবং এর একেবারে চূড়ায় তিনটি বিশাল সোনালি মূর্তি স্থাপন করা হবে, যা দূর থেকেও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

 

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই মেগা প্রকল্পগুলোর প্রায় প্রতিটিই ইতোমধ্যে নানামুখী কাঠামোগত, আইনি ও নান্দনিক সমস্যার আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। কোথাও স্থাপনার স্থাপত্যগত নকশা নিয়ে রুচিশীল মানুষেরা তীব্র সমালোচনা করছেন, কোথাও আবার নির্মাণকাজের জটিলতা এবং অত্যাধিক ব্যয়ের কারণে প্রকল্প হোঁচট খাচ্ছে, আবার কোনো কোনো প্রকল্প সরাসরি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে থমকে আছে।

 

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই বিজয় তোরণটি আর কেবল একটি সাধারণ স্মারক বা স্থাপত্যকীর্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন এমন একটি সামরিক স্থাপনায় রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, নিরাপত্তা এবং রাজনীতির এক অত্যন্ত জটিল সমীকরণ।

 

ঐতিহাসিক স্থাপনা, ব্যস্ত বিমানবন্দর এবং রাজধানীর অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃশ্যপটে এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে যে পাহাড়সম প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো নিরসন না করে চলতি মাসেই এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিরাট এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়েই দাঁড়িয়ে রইল।