মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র: মার্কো রুবিও

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

জাতিসংঘে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র: মার্কো রুবিও
ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অবসরে বৈরী সম্পর্কের অচলাবস্থা ভেঙে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে নিজেদের আগ্রহ ও প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

তবে এই মুহূর্তে দুই পক্ষের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সূচি চূড়ান্ত হয়নি বলে স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই ইতিবাচক অথচ শর্তসাপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন।

 

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান তীব্র সামরিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সংঘাতের আবহে এই ধরনের সম্ভাব্য আলোচনা দুই দেশের মধ্যকার বরফ গলানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল এনবিসি নিউজের বহুল প্রচারিত ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান যে, ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কোনো নীতিগত আপত্তি বা অনীহা নেই।

 

তবে কূটনীতির স্বার্থে কেবল লোকদেখানো কোনো আনুষ্ঠানিকতায় সময় নষ্ট করতে রাজি নয় ওয়াশিংটন। রুবিও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, সম্ভাব্য এই বৈঠকটি তখনই অর্থবহ ও যুক্তিযুক্ত হবে, যখন এর মধ্য দিয়ে বাস্তবসম্মত এবং ইতিবাচক কোনো ফলাফল অর্জনের সুস্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হবে।

 

তাঁর মতে, আলোচনার মূল লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর পথ উন্মুক্ত হলেই কেবল এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ফলপ্রসূ হতে পারে। সাক্ষাৎকার চলাকালে তিনি অকপটভাবে বলেন যে, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে একটি উন্মুক্ত ও নমনীয় মনোভাব বজায় রেখেছে।

 

যদিও এই মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নির্ধারিত হয়নি, তবুও ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তা আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে।

 

ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল কৌশলগত লক্ষ্য এবং অপরিবর্তনীয় অবস্থানের বিষয়টিও এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

 

তিনি কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখে ওয়াশিংটনের লাল দাগ বা চূড়ান্ত সীমার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আলোচনার একমাত্র ও প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ।

 

রুবিও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, তেহরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না এবং যেকোনো মূল্যে তা প্রতিহত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো অবস্থাতেই এবং কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া হবে না।

 

এই বিষয়ে ওয়াশিংটন এবং তাদের কৌশলগত মিত্রদের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ভিন্নমতের অবকাশ নেই। ফলে যদি কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তবে তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সংবরণের বিষয়টিই আলোচনার প্রধান শর্ত হিসেবে টেবিলের শীর্ষে থাকবে।

 

এদিকে চলমান তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের সুবিধার্থে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় ভিসা প্রদান করেছে ওয়াশিংটন।

 

আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও সদর দপ্তর চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দেওয়া এই অনুমোদনের আওতায় ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ পদস্থ কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।

 

বিশেষ করে ইরানের মধ্যপন্থি ও সংস্কারকামী হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস ঘটানোর যে তাগিদ দেখা যাচ্ছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নমনীয় বক্তব্য সেই পথকে কিছুটা মসৃণ করতে পারে।

 

জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের একই শহরে উপস্থিত থাকা একটি বিরল কূটনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্ভাব্য আলোচনার এই বাতাবরণকে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ।

 

বৈশ্বিক এই শান্তি সংস্থার পক্ষ থেকে সবসময়ই সংঘাত নিরসনে সংলাপের ওপর জোর দেওয়া হয়ে থাকে। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে মন্তব্য করেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেকোনো স্তরের আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়াটা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বৈরী দুই পক্ষের মধ্যকার এই সম্ভাব্য সংলাপ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনার স্থায়ী অবসানের পথকে সুগম করতে বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য ক্রমাগত আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক সম্ভাবনার এই ক্ষীণ আশার পেছনে রয়েছে গভীর অবিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক বৈরিতার এক সুবিশাল কালো ছায়া।

 

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মতপার্থক্য কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক আধিপত্য, বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধকামী সংগঠনকে দেওয়া তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন, কৌশলগত সামুদ্রিক জলপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পর্বতসম দূরত্ব বিরাজমান রয়েছে।

 

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আঞ্চলিক নানা সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের কারণে এই আস্থার সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তেহরান তাদের ওপর আরোপিত একতরফা ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইছে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থ ও মিত্রদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা।

 

এই চরম বৈরী ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন সবসময়ই আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র ও অনন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের শীর্ষ নেতারা এই সময়ে একই ছাদের নিচে সমবেত হন, যার ফলে প্রথাগত রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে একান্ত বৈঠক বা অনানুষ্ঠানিক ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি পরিচালনার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়।

 

অতীতেও এমন বহু নজির রয়েছে যেখানে চরম শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে বড় ধরনের যুদ্ধ বা কূটনৈতিক সংকট এড়াতে সক্ষম হয়েছে।

 

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে কোনো কার্যকর প্রাথমিক যোগাযোগ এই মুহূর্তে স্থাপিত হতে পারে, তবে তা দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পরমাণু আলোচনা পুনরায় চালুর পথকে উন্মুক্ত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

 

সার্বিক বিশ্লেষণে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের অনমনীয় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানকে স্পষ্ট করে, অন্যদিকে তা কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের একটি সূক্ষ্ম দরজাও উন্মুক্ত রাখে।

 

এখন সম্পূর্ণ বিষয়টি নির্ভর করছে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। ইরান কি এই সম্ভাব্য আলোচনার সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করার পথে হাঁটবে, নাকি নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে কঠোর প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে-তা সময়ই নির্ধারণ করে দেবে।

 

তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিউইয়র্কের বৈশ্বিক সম্মেলনে দুই পক্ষের মধ্যে যদি সামান্যতম ফলপ্রসূ আলাপও সম্ভব হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা রক্ষা করতেই সহায়তা করবে না, বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে এক বিশাল স্বস্তির বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে।

 

- আল জাজিরা