বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জাতিসংঘ পরিষদে ট্রাম্প

অন্যরা কেবল শান্তির কথা বলেছে, আমি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

অন্যরা কেবল শান্তির কথা বলেছে, আমি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছি
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে চলমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনে এক অত্যন্ত সুদৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রভাবশালী ভাষণ প্রদান করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

মঙ্গলবার বিশ্বনেতাদের এই সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক মিলনমেলায় দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বশান্তি, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবিসংবাদিত সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর এই ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য ছিল-কথার চেয়ে কাজের গুরুত্ব এবং শক্তির মাধ্যমে শান্তি নিশ্চিতকরণ।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যেখানে দশকের পর দশক ধরে কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার বুলি আউড়েছেন এবং অন্তহীন আলোচনা চালিয়ে গেছেন, সেখানে তিনি তাঁর প্রশাসনের অধীনে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে প্রকৃত শান্তি স্থাপন করে দেখিয়েছেন।

 

চলমান বহুমুখী বৈশ্বিক সংঘাত ও চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বলিষ্ঠ ও আপসহীন বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও গভীর বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।

 

সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অবস্থান, অসীম সম্ভাবনা এবং ক্ষমতার কথা সগর্বে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ, ক্ষমতাধর ও প্রভাব বিস্তারকারী একটি দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোনোভাবেই বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বা বিপজ্জনক কোনো ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রকে আর এক দিনের জন্যও নিজেদের ধ্বংসাত্মক শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ দিতে বিন্দুমাত্র রাজি নন।

 

বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি তাঁর প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অভূতপূর্ব সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে অন্যরা কেবল দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো নিয়ে অন্তহীন কথা বলেছেন এবং কালক্ষেপণ করেছেন, সেখানে তিনি সরাসরি কাজ করে তার বাস্তব প্রমাণ দিয়েছেন।

 

ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে উল্লেখ করেন, যেখানে অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কেরা কেবল শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

তাঁর ভাষ্যমতে, যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো বৈশ্বিক হুমকিগুলোকে কৌশলে এড়িয়ে গেছে বা নিজেদের স্বার্থে উপেক্ষা করেছে, তখন তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে সেই হুমকিগুলোর সরাসরি মোকাবিলা করেছেন।

 

তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেখানে অন্যান্য দেশগুলো কেবল সাহসের কাল্পনিক গল্প শুনিয়েছে, সেখানে আমেরিকা বাস্তবে সেই অকুতোভয় সাহসিকতার প্রমাণ সমগ্র বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে।

 

অন্যদের শক্তির মৌখিক প্রতিশ্রুতির বিপরীতে তিনি নিজের প্রশাসনের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন যে, তিনি আমেরিকার সেই অন্তর্নিহিত বিপুল শক্তিকে বাস্তবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী, সুরক্ষিত ও অপ্রতিরোধ্য দেশে পরিণত করেছেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণের একটি বিশাল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ জুড়ে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রসঙ্গ। বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের জন্য সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

 

তিনি সাধারণ পরিষদে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে দিয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন যে, এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য ইরানের চেয়ে বড় কোনো হুমকি আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।

 

ট্রাম্প অভিযোগ করেন, বিগত দিনগুলোতে ইরান আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে ধীরে ধীরে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে এক ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল।

 

তবে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, তাঁর প্রশাসন কোনো অবস্থাতেই ইরানকে আর একটুও বেড়ে ওঠার বা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্য কোথাও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ দেবে না।

 

সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে তিনি ইরানের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে ইঙ্গিত করে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই, কোনো অবস্থাতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী বা পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না। এটি মার্কিন প্রশাসনের একটি অলঙ্ঘনীয় চূড়ান্ত সীমারেখা বা রেড লাইন বলে তিনি প্রচ্ছন্নভাবে বুঝিয়ে দেন।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কঠোর ও অনমনীয় বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের দগদগে ইতিহাস, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন আক্রমণ পরিচালনা করে।

 

সেই অভাবনীয় সামরিক হামলার পরপরই ওই অঞ্চলে এক তীব্র ও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়, যা একটানা দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে চলমান ছিল। এই চল্লিশ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছিল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার ও অর্থনীতিতে এর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

 

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপ এবং জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর নিরলস মধ্যস্থতায় বিবদমান দেশগুলোর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, বাস্তবে সেই চুক্তি কখনোই পূর্ণাঙ্গরূপে বা কার্যকরভাবে মাঠে বাস্তবায়িত হয়নি।

 

বরং উভয় পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের চরম উত্তেজনা, গভীর অবিশ্বাস এবং ছায়াযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য, আক্রমণাত্মক এবং পেশিশক্তিনির্ভর ভাষণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে সম্পূর্ণ এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

 

যেখানে এই অধিবেশনের ঠিক আগেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বনেতাদের প্রতি সংঘাত পরিহার করে পারস্পরিক ঐক্য, সংহতি ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট সমাধানের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই চরম সামরিক ও শক্তির প্রদর্শনী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশকে গভীরভাবে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

 

ইউরোপীয় মিত্ররা থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এ ধরনের কঠোর ও আপসহীন নীতি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

 

অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর কট্টর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি আমেরিকার জাতীয়তাবাদী পররাষ্ট্রনীতির এক সুস্পষ্ট ও জোরালো প্রতিফলন।

 

পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ভাষণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপতির বক্তব্য নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেশিশক্তি, সামরিক সক্ষমতা ও অনমনীয় পররাষ্ট্রনীতির এক চূড়ান্ত ও অমোঘ বার্তা।

 

ইরানকে কেন্দ্র করে তাঁর এই কঠোর অবস্থান এবং নিজের প্রশাসনকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র কাণ্ডারি হিসেবে দাবি করার মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য ও মোড়লিপনা বজায় রাখারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ কূটনীতিকরা এখন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কড়া বার্তার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তায় ঠিক কী ধরনের সুদূরপ্রসারী, দীর্ঘমেয়াদি ও নাটকীয় পরিবর্তন সাধিত হয়।

 

- সিএনএন