বৈশ্বিক এই বিচারিক সংস্থাকে সরাসরি ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ এবং ‘দুর্বৃত্ত’ আদালত হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্বের সকল দেশকে অবিলম্বে এই আদালত থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া তাঁর এই আক্রমণাত্মক ও অনমনীয় ভাষণ আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর এক বিশাল আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত কঠোর ভাষায় দাবি করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধী সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান, এই আন্তর্জাতিক আদালতের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রকার আস্থা বা ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মার্কিন প্রশাসন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের কোনো সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক কিংবা ঘনিষ্ঠ কাউকে এই আদালতের মাধ্যমে কোনো প্রকার তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে দেবে না।
তাঁর দাবি অনুযায়ী, এই আদালতের সার্বভৌম যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কিংবা মার্কিন নাগরিকদের ওপর কোনো ধরনের বিচারিক এখতিয়ার বা আইনি অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি সাধারণ পরিষদে উপস্থিত বিশ্বের অন্যান্য সার্বভৌম দেশগুলোর প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিটি স্বাধীন দেশের উচিত কালবিলম্ব না করে এই তথাকথিত দুর্বৃত্ত আদালতের সদস্যপদ থেকে অবিলম্বে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এমন কঠোর ও নজিরবিহীন অবস্থানের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সংবেদনশীল ঘটনাপ্রবাহ জড়িয়ে রয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক অভিযানের সময় সেখানকার সাধারণ মানুষকে দীর্ঘকাল ধরে মৌলিক খাদ্যদ্রব্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে অনাহারে রাখার মারাত্মক অভিযোগ ওঠে।
যুদ্ধাপরাধের এই স্পষ্ট অভিযোগে দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তেল আবিবের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও সামরিক মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই আদালতের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চরম অবস্থান নেয় এবং আদালতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলে।
এর আগেও ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে শিশুদের জোরপূর্বক তাদের নিজেদের ভূখণ্ড থেকে রাশিয়ায় স্থানান্তরের অভিযোগে খোদ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধেও একই আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
বৈশ্বিক পরাশক্তি ও তাদের মিত্রদের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এই বিচারিক পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত আদালতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বিরোধকে চরম এক প্রকাশ্য রূপ দান করেছে। আন্তর্জাতিক বিচারিক কাঠামোর তীব্র বিরোধিতার পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দীর্ঘ ভাষণে বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজের প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, যেখানে অন্যান্য বিশ্বনেতারা কেবল মুখেই শান্তির কথা বলেন এবং কালক্ষেপণ করেন, সেখানে তিনি সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাস্তব বিশ্বে শান্তি স্থাপন করে দেখিয়েছেন।
ট্রাম্প উপস্থিত বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি বিশ্বের বিপজ্জনক কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীকে আর একটি দিনের জন্যও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দিতে রাজি নন।
তাঁর ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন অন্য দেশগুলো কেবল কথার ফুলঝুরি ছড়িয়েছে, তখন তিনি বাস্তবে কাজ করে দেখিয়েছেন। অন্যরা যখন বিভিন্ন বৈশ্বিক হুমকিকে স্রেফ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে গেছে, তখন তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সেই সমস্ত বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।
আমেরিকার সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্যের কথা সগর্বে পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো যখন কেবল সাহসের বুলি আউড়েছে, আমেরিকা তখন বাস্তবে নিজেদের অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন করেছে।
যেখানে অন্যান্য পরাশক্তিগুলো শক্তির নিছক প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে, সেখানে তিনি সেই বাস্তব শক্তিকে দেশের প্রতিরক্ষায় সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সমগ্র বিশ্বের বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন।
তাঁর মতে, কথার ফুলঝুরির চেয়ে পেশিশক্তি ও অটল সংকল্পের মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রকৃত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। সাধারণ পরিষদের মঞ্চ থেকে দেওয়া তাঁর এই শক্তিনির্ভর কূটনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ভাষণের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অংশ জুড়ে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রসঙ্গ। মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ইরানের চেয়ে বড় কোনো সংকট আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, বিগত সময়গুলোতে ইরান সমগ্র বিশ্বকে মারাত্মক এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করছিল।
তবে তাঁর প্রশাসন কোনো অবস্থাতেই দেশটিকে আর এক বিন্দুও বেড়ে ওঠার সুযোগ দেবে না। ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরানকে কখনোই এবং কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী বা পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অলঙ্ঘনীয় চূড়ান্ত সীমারেখা।
জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ও আপসহীন বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে গণহারে বেরিয়ে যাওয়ার এই প্রকাশ্য আহ্বান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক বিচারিক কাঠামোকে চরম এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোসহ আদালতের অন্যতম অংশীদার রাষ্ট্রগুলো ট্রাম্পের এই চরম অবস্থানের বিপরীতে আন্তর্জাতিক আইনের সার্বজনীনতা রক্ষার বিষয়ে কতটা সোচ্চার হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
পরিশেষে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে সম্পূর্ণ বর্জন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি প্রদর্শনের এই কড়া বার্তা বিশ্ব কূটনীতিকে এক নতুন ও অত্যন্ত উত্তপ্ত মেরুকরণের দিকে ধাবিত করবে।