খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস নাও’ এবং আন্তর্জাতিক মতামত জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই রেকর্ড পরিমাণ জনপ্রিয়তাহীনতা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং আসন্ন নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টিকেও এক বিরাট রাজনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় মার্কিন জনগণের ট্রাম্পের নীতির প্রতি এই গভীর অনাস্থা এবং অসন্তোষ দেশটির সার্বিক শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সাময়িকী ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ পরিচালিত সর্বশেষ জরিপটির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভের প্রকৃত চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জরিপের তথ্যানুসারে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতি বর্তমানে দেশের মাত্র সাইত্রিশ শতাংশ ভোটারের অনুমোদন রয়েছে, যেখানে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ একষট্টি শতাংশ নাগরিকই তাঁর গৃহীত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিয়েছেন।
পরিসংখ্যানগতভাবে, এক হাজার নয়শো নব্বই সালের পর থেকে পরিচালিত যেকোনো মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্ববর্তী পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে এটিই কোনো আসীন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সমর্থনের এক চরম নজির।
রিপাবলিকান পার্টির জন্য এটি একটি মারাত্মক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে, কারণ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাসীন দল এমনিতেই এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, আর ট্রাম্পের এই সর্বনিম্ন রেটিং সেই শঙ্কাকে বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
জনপ্রিয়তায় এমন চরম বিপর্যয় ও রাজনৈতিক ধসের নেপথ্যে মূলত দেশটির চলমান আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তার মারাত্মক প্রভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
চলতি বছরের আঠাশে ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা প্রায় সাত মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধকবলিত পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বস্তরের জনগণ অর্থনৈতিক চাপে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী খরচ সামলানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সক্ষমতার ওপর জন আস্থা হ্রাস পেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে মাত্র সতেরো শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক জনসমর্থন ছিল প্রায় সাতচল্লিশ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং প্রখ্যাত জরিপ সংস্থা ইপসোসের এক যৌথ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত একুশে সেপ্টেম্বর নাগাদ তাঁর সেই সমর্থন নাটকীয়ভাবে কমে সর্বনিম্ন বত্রিশ শতাংশে নেমে আসে।
এই হার ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেনের শাসনের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে পাওয়া সর্বনিম্ন পঁয়ত্রিশ শতাংশ সমর্থনের চেয়েও কম। অন্যান্য বিশিষ্ট জরিপ সংস্থাসমূহের আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ পর্যবেক্ষণ করলেও একই ধরনের হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে।
উদাহরণস্বরূপ, ‘আমেরিকান রিসার্চ গ্রুপ’ ট্রাম্পের বর্তমান সমর্থন মাত্র ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে বলে দাবি করেছে, আবার ‘হার্ভার্ড ক্যাপস’ পরিচালিত জরিপে এটি সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ দেখা গেলেও সার্বিক গড় হিসেবে ‘সিলভার বুলেট’ তাদের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের নিট অনুমোদনকে মার্কিন ইতিহাসে রেকর্ড সর্বনিম্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত সামরিক পদক্ষেপের প্রতি মার্কিন জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশটির মাত্র একত্রিশ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধ নীতিকে সমর্থন করছেন।
বিপরীতে, প্রায় তিরাশি শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত সহজে শেষ হবে না, বরং তা দীর্ঘদিন ধরে চলতেই থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে আরও বেশি পঙ্গু করে তুলবে।
নাগরিকদের এই তীব্র অসন্তোষ ও জনরোষ প্রশমন করতে এবং নিজেদের মূল ভোটার ভিত্তিকে ধরে রাখার জন্য ট্রাম্প কৌশলগতভাবে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর ওপর সব দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন।
একই সঙ্গে সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর ক্ষোভ কমাতে তিনি ভোটার প্রতি পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিশেষ ডিভিডেন্ড বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার এক অভিনব প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে অর্থ প্রদান করে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের এই রাজনৈতিক কৌশল আদৌ বাস্তবে কোনো ইতিবাচক ফল আনবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মনে গভীর সন্দেহ রয়েছে।
ভোটারদের এই তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ও ক্ষোভের আগুন কেবল সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ ভিত্তির মধ্যেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র সেপ্টেম্বর মাসের এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থনের হার বিরাশি শতাংশ থেকে একলাফে কমে তিয়াত্তর শতাংশে নেমে এসেছে।
দেশের বর্তমান জীবনযাত্রার মান এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রথমবারের মতো তাঁর নিজ দলের ভোটারদের একটি বড় অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, দলটির প্রায় ৫১ শতাংশ সমর্থকই ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পদক্ষেপে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যা রিপাবলিকান পার্টির জন্য আসন্ন ব্যালট যুদ্ধে জেতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ফাটল হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হওয়া গ্যালাপ জরিপের ধারাবাহিক তথ্য অনুযায়ী, যদি কোনো প্রেসিডেন্টের জাতীয় জনপ্রিয়তার হার ৫০ শতাংশের নিচে অবস্থান করে, তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর নিজস্ব দল গড়ে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় ৩৭টি আসন হারিয়ে থাকে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করায় আগামী তিনই নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি এক নজিরবিহীন ভরাডুবির মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
যদি এই পূর্বাভাস সত্য প্রমাণিত হয়, তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে রিপাবলিকান পার্টি কেবল কোণঠাসাই হবে না, বরং ট্রাম্পের অবশিষ্ট মেয়াদে আইন প্রণয়নসহ রাষ্ট্রীয় সকল নীতি বাস্তবায়নে চরম স্থবিরতা নেমে আসবে।
উদ্ভূত এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে এক ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। সম্প্রতি আয়োজিত একাধিক জনসভায় তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন আবেদন জানিয়ে বলেছেন, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যালট পেপারে তাঁর নাম সরাসরি না থাকলেও সমর্থকরা যেন তাঁকে ব্যালটে ধরে নিয়েই ভোট প্রদান করেন।
তিনি বিশ্বাস করেন যে, সমর্থকদের এই ব্যক্তিগত আনুগত্যই হয়তো তাঁকে এবং তাঁর দলকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেবেন কি না, তা দেখার জন্য আগামী তিনই নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
পুরো বিশ্ব এখন গভীরভাবে নজর রাখছে ওয়াশিংটনের দিকে, যেখানে একটি রাজনৈতিক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত রূপ দিতে পারে আগামী পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে।