বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ট্রাম্পের উষ্ণ অভ্যর্থনা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ট্রাম্পের উষ্ণ অভ্যর্থনা
ছবি : Collected

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতাদের বহুল প্রতীক্ষিত সাক্ষাৎ অবশেষে বাস্তবে রূপ নিল। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পারস্পরিক স্বার্থের জটিল সমীকরণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ আমন্ত্রণে গত ২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে পৌঁছান তিনি। এই সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লি ইউয়ান।

 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এই বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে, কারণ তাদের এই সাক্ষাতের ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে।

 

স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত ওয়াশিংটনের বিখ্যাত অ্যান্ড্রুজ সামরিক বিমানঘাঁটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে বহনকারী বিশেষ উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে।

 

বিমান থেকে অবতরণের পরপরই তাদের অত্যন্ত উষ্ণ ও জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানঘাঁটিতে সশরীরে উপস্থিত থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ফার্স্ট লেডি পেং লি ইউয়ানকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।

 

এ সময় একদল মার্কিন শিশু চীনের রাষ্ট্রপ্রধান ও ফার্স্ট লেডির হাতে দৃষ্টিনন্দন ফুল তুলে দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সেখানে লাল গালিচা বিছানো হয়। লাল গালিচার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর চৌকস সদস্যরা শি জিনপিংকে সম্মানসূচক 'গার্ড অব অনার' প্রদান করেন।

 

আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সামরিক ব্যান্ডের সুরের মূর্ছনায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। একই সঙ্গে ২১ বার তোপধ্বনি এবং আকাশে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান উড়িয়ে চীনের প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও অভিবাদন জানানো হয়, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

চীনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর পর এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের মাটিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ফার্স্ট লেডি পেং লি ইউয়ানকে আতিথেয়তা প্রদান করতে পেরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।

 

তিনি এই সফরকে সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণকারী একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বিশ্বের অন্যতম ‘মহান নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তার এই পদার্পণের মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় একটি মহান অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

এই সফরের মধ্য দিয়ে উভয় নেতা বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ মতবিনিময় করবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

 

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখার পর এক লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া ও বার্তা তুলে ধরেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনা সরকার ও দেশের আপামর জনসাধারণের পক্ষ থেকে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দুটি মহান দেশ এবং এই দুই দেশের জনগণও নিজ নিজ জায়গায় মহান।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

 

তাই বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থে দুই দেশের একে অপরের অংশীদার হওয়া উচিত, কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, চীনা জাতির মহান পুনরুদ্ধার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’ বা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এই দুই দেশের জাতীয় লক্ষ্য ও ভিশন কখনোই পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

 

বরং এই দুটি লক্ষ্য একে অপরের পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে, পারস্পরিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সর্বোপরি সমগ্র বিশ্বকে গভীরভাবে উপকৃত করতে পারে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি বছরের মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফল চীন সফরের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন, সেই সফরের সময় উভয় দেশ চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গঠনমূলক, কৌশলগত এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। সেই ঐতিহাসিক সমঝোতা ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমাগত উন্নয়নের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

 

শি জিনপিং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি টেকসই ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতাই হবে প্রধান ভিত্তি।

 

তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও তা হতে হবে অত্যন্ত সংযত, পরিমিত এবং সুষ্ঠু কাঠামোর অধীন। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক, তবে তা যেন অবশ্যই নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয় এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে বিশ্ব শান্তির সম্ভাবনা যেন সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় থাকে, সেদিকে উভয় দেশকেই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

এভাবেই একুশ শতকের নতুন যুগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির শান্তিপূর্ণ এবং সঠিকভাবে সহাবস্থানের একটি টেকসই পথ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

 

বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, বিশ্ব প্রতিনিয়ত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার যে আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা, তা এখনো আগের মতোই অটুট রয়েছে।

 

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের যে ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে, তাতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। সমগ্র বিশ্ব তাকিয়ে আছে এই দুই দেশের নেতাদের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দিকে।

 

এই ঐতিহাসিক সফরের দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য শুল্ক, প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিরসনে এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

শুধু এশিয়া বা আমেরিকা নয়, বরং ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিও পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। যখনই এই দুই বৃহৎ পরাশক্তির মধ্যে কোনো ধরনের বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখনই বিশ্বব্যাপী বাজারগুলোতে একটি ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 

তাই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই সফরকে কেন্দ্র করে বিশ্বনেতাদের মধ্যেও এক ধরনের স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সংকটগুলোতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন প্রায় অসম্ভব।

 

সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই দুই নেতার এই বৈঠক শুধুমাত্র তাদের নিজেদের দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।

 

সবশেষে, এই সফরের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে মতবিনিময় করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

 

একই সঙ্গে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার গঠনমূলক ও কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের বিষয়বস্তুকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উদীয়মান ক্ষেত্রে দুই দেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করার দৃঢ় প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

 

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে তিনি গভীরভাবে আগ্রহী। উভয় পক্ষের আন্তরিক ও যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তার এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর অবশ্যই অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

 

দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের এই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতামূলক মনোভাবের মাধ্যমে শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সার্বিক কল্যাণই বৃদ্ধি পাবে না, বরং তা সমগ্র বিশ্বের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব শান্তিতে এক নতুন আশার সঞ্চার করবে।