সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানতে কঠোর আইনি কাঠামোর দাবি বিল গেটসের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানতে কঠোর আইনি কাঠামোর দাবি বিল গেটসের
ছবি : Collected

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও এর সম্ভাব্য ভয়াবহ অপব্যবহার রোধে মার্কিন আইনপ্রণেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে কঠোর আইন প্রণয়নের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।

 

প্রযুক্তিজগতের এই অগ্রপথিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তি যদি কোনোভাবে অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তবে তার ভয়াবহ পরিণতিতে বিশ্বজুড়ে প্রায় এক শ কোটি মানুষের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে কিংবা মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।

 

গত রোববার বিশিষ্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'মিট দ্য প্রেস'-এ সাংবাদিক ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।

 

সাক্ষাৎকারে বিল গেটস পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, এআই প্রযুক্তি নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।

 

প্রযুক্তিটির নিরাপদ ব্যবহার, সার্বিক নজরদারি এবং সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে একটি বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো অবিলম্বে তৈরি করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, মানবসভ্যতার জন্য ক্ষতিকর কোনো বড় ধরনের সাইবার হামলা বা ভয়াবহ জৈব হামলার মতো মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নড়েচড়ে বসব, নাকি আগেই সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব?

 

তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তি বর্তমানে এমন এক অভাবনীয় ও শক্তিশালী পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে, এর ন্যূনতম অপব্যবহার বিশ্ববাসীর জন্য অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে বিল গেটসের এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে এআই নিশ্চিতভাবেই ঠিক এক শ কোটি মানুষকে হত্যা করবে; বরং তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা অবধারিত ভবিষ্যৎবাণী না করে মূলত এটি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ক্ষতিকর মানসে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক এআই টুলস বিশ্ববাসীর বিশাল অংশের জন্য এক অভূতপূর্ব ও অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে সক্ষম।

 

প্রযুক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো মেশিন বা সিস্টেম হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার প্রচলিত ‘কিল সুইচ’ ধারণাকেও যথেষ্ট বলে মনে করেন না এই প্রযুক্তিবিদ। তাঁর মতে, শুধু একটি এআই সিস্টেমের প্লাগ টেনে বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেই সব ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না, কারণ বর্তমান এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে নিজে থেকেই গোটা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক দখল করে তা বন্ধ করা অসম্ভব করে তুলবে।

 

তাই শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে শুরু থেকেই এআই সিস্টেমের গতিবিধি ও আচরণ সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এআই কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তি কিছু নিরাপত্তা ও নজরদারির দায়িত্ব অর্পণ করা হলে শিল্পখাতে কিছুটা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, তবে এতে প্রযুক্তির সার্বিক উন্নয়নের গতি নাটকীয়ভাবে ব্যাহত হবে না বলেই তিনি মনে করেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এআই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত অবশ্যকীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কেবল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মর্জির ওপর নির্ভর করে বসে থাকা নিরাপদ নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে এআই নিরাপত্তার অনেক সতর্কতাকে ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত দাবি হিসেবে অভিহিত করলেও, বিল গেটস স্পষ্টভাবে জানান যে এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি কোনো মনগড়া প্রোপাগান্ডা নয় এবং নীতিনির্ধারকসহ সকলকেই এই প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকতে হবে।

 

গেটসের এই গভীর আশঙ্কার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তি নিজেই নয়, বরং সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক বা ব্যবহারকারী মানুষ। তাঁর মতে, অতীতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বা বড় মাত্রার সাইবার হামলা কেবল পরাশক্তিধর রাষ্ট্র বা বিশাল প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই চালানো সম্ভব হলেও, এখন সামান্য কিছু ক্ষতিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তির ছোট গোষ্ঠীও অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামুকে সম্পূর্ণ অচল করে দিতে পারে, গোটা আর্থিক ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত করতে পারে কিংবা মারাত্মক জৈবিক আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে।

 

তাই এআই প্রযুক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান্তরাল গতিতে শক্তিশালী করা জরুরি। শুধু নিরাপত্তাই নয়, বরং শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের ওপর এআইয়ের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিল গেটস।

 

গত আগস্ট মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি রোবট ও এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের চাকরি হারানোর ঝুঁকির কথা বলেছিলেন। এই সংকট কাটাতে তিনি মানুষের জন্য সংরক্ষিত কাজের ধারণা বা 'হিউম্যান রিজার্ভড জবস'-এর প্রস্তাব দেন, যার মাধ্যমে শিশু পরিচর্যা বা জুুরির দায়িত্ব পালনের মতো কিছু ক্ষেত্র সামাজিক ও মানবিক কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাইরে মানুষের হাতেই সুরক্ষিত রাখা যেতে পারে।

 

একই সঙ্গে যন্ত্রের মাধ্যমে মানবসম্পদ প্রতিস্থাপনের অর্থনৈতিক প্রবণতা রোধ করতে করব্যবস্থায় উপযুক্ত সংস্কার আনার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি। এআই নিয়ে এত কড়া সতর্কতা উচ্চারণ করলেও প্রযুক্তিটিকে পুরোপুরি ধ্বংসাত্মক বা কেবল হুমকি হিসেবে দেখছেন না বিল গেটস।

 

বরং চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে নিজের দাতব্য ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক শিক্ষা এবং কৃষিকাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানোর জোরালো পক্ষে কথা বলেছেন।

 

বিশ্বের চরম দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে এআই একটি বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। বিশেষ করে তুলনামূলক কম প্রতিনিধিত্ব থাকা এবং বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন স্থানীয় ভাষার জন্য এআই প্রযুক্তিকে আরও বেশি কার্যকর ও উপযোগী করে তুলতে তাঁর ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্যোগে উদারহস্তে অর্থায়ন করে যাচ্ছে।

 

অর্থাৎ বিল গেটসের সামগ্রিক বক্তব্যে প্রযুক্তিটির একটি দ্বৈত ও বাস্তবসম্মত রূপ ফুটে উঠেছে, যেখানে একদিকে রয়েছে মানবকল্যাণে এর অসীম সম্ভাবনার দুয়ার, আর অন্যদিকে রয়েছে যথাযথ নজরদারির অভাবে এর ভয়াবহ অপব্যবহারের আশঙ্কা।

 

শীতল যুদ্ধের সময় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক আলোচনা হয়েছিল, এআইয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার কারণে সেরকম বৈশ্বিক সমঝোতা অর্জন করা কিছুটা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

 

পরিশেষে বিল গেটসের সুনির্দিষ্ট বার্তাটি হলো-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঐতিহাসিক বিকাশকে কৃত্রিমভাবে থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির অগ্রগতির ঠিক সমান্তরালে প্রয়োজনীয় আইন, কঠোর নজরদারি ও ত্রুটিহীন নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই সরকার ও প্রযুক্তি খাতের নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান, এনবিসি নিউজ