রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোট গণনার সময় ফল পাল্টানোর চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

ভোট গণনার সময় ফল পাল্টানোর চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প!
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মিডটার্ম নির্বাচনে ভোট গ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময়কে ঘিরে দেশটির বিশিষ্ট নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মহল থেকে এক গভীর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

তাঁদের মতে, ভোট প্রদান শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের মধ্যবর্তী এই অতি সংবেদনশীল সময়কে কাজে লাগিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সহযোগী ও সমর্থকেরা নির্বাচনি ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন কিংবা সার্বিক ফলাফল নিজেদের অনুকূলে পাল্টে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাতে পারেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য সূত্রে এই বিষয়ে বিশদ পর্যালোচনা প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ধরনের জাতীয় নির্বাচনগুলোকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

 

এবারের প্রতিযোগিতায় যে দলই জয়ী হোক না কেন, চূড়ান্ত গণনা না হওয়া পর্যন্ত দেশটির জাতীয় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন এবং বিশেষ করে ভোট গণনার নিবিড় মুহূর্তগুলোতে যেসব তথ্যগত শূন্যতা তৈরি হয়, তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষায় এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জটিল ও বিকেন্দ্রীভূত নির্বাচনি ব্যবস্থা অনুযায়ী, প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব নিয়ম ও প্রবিধান কার্যকর থাকে। ফলে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রগুলোতে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও চূড়ান্ত ও সরকারি ফলাফল প্রকাশ করতে সাধারণত কয়েক দিন থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

 

বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো সুবিশাল এবং বিপুল জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্যগুলোতে যেখানে বিশালসংখ্যক নাগরিক ডাকযোগে কিংবা 'মেইল-ইন' ব্যালটের মাধ্যমে আগাম ভোট প্রদান করেন, সেখানে এই গণনা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হয়।

 

সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের অভিমত অনুযায়ী, ভোট গণনার এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টিই মূলত সবচেয়ে অরক্ষিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কারণ এই নির্দিষ্ট সময়ের সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও ট্রাম্পের অনুসারীরা ভিত্তিহীন বিভিন্ন কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে।

 

সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচনি স্বচ্ছতা সম্পর্কে গভীর সংশয় ও অনাস্থা তৈরি করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এই সময়টিতে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর প্রবণতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

পূর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও তাঁর অনুগামীরা ডাকযোগে দেওয়া ভোটের ওপর বিভিন্ন ধরনের কঠোর প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য জোর আইনি ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ও নিম্ন আদালতগুলোর রায়ে সেইসব প্রয়াস প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

 

বিচার বিভাগীয় ও আইনি পথ সংকুচিত হয়ে আসায় এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্পের সহযোগীরা গণনার এই অন্তর্বর্তী সময় বা 'কাউন্টিং উইন্ডো' ব্যবহার করে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিষোদ্গার ছড়াতে পারেন।

 

ভুয়া ও মনগড়া তথ্য প্রচারের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার এই সম্ভাব্য অপচেষ্টা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষকেরা বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন।

 

তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গরাজ্যে যদি গণনা বিলম্বিত হয়, তবে সেই সুযোগে নির্বাচনি মেশিন বিকল হওয়া বা অনিয়মের কাল্পনিক গল্প তৈরি করে মানুষের জনমতকে বিভ্রান্ত করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। ফলে নির্বাচন উত্তর শান্তিশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।

 

সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বিচার বিভাগ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীসমূহ একটি নির্দিষ্ট 'নীরবতা' বা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখে, যাতে নির্বাচনি মাঠে তাঁদের কোনো পদক্ষেপ সাধারণ প্রার্থীর জনমতে প্রভাব ফেলতে না পারে।

 

কিন্তু আসন্ন মিডটার্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই ঐতিহ্যবাহী নিয়মের চরম ব্যত্যয় লক্ষ করা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা স্বরাষ্ট্র বিভাগ বর্তমানে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটার তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ ও যাচাইয়ের নামে বেশ কিছু বিতর্কিত ও সমালোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

 

যদিও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের হস্তক্ষেপ বা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তবুও গোয়েন্দা ও নির্বাচন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি অবকাঠামো বা মূল ভোট গণনা প্রক্রিয়ার কারিগরি দিকটিতে কোনো বিদেশি শক্তি সরাসরি প্রবেশ করে কিংবা হ্যাক করে হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আরও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসন বারবার নির্বাচনি সুরক্ষার কথা বললেও তাঁদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট।

 

সাইবার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির (সিআইএসএ) নির্বাচনি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট খাতের বরাদ্দকৃত বাজেট এবং কর্মী সংখ্যা ট্রাম্প প্রশাসনের আমলেই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে।

 

এই ধরনের আর্থিক ও জনবল সংকোচনের ফলে স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভাব্য সাইবার হামলা বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মোকাবিলা করা আগের চেয়ে জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তা সত্ত্বেও, সরকারি বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া বৈরী পরিস্থিতি প্রতিহত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীল অবস্থান বজায় রাখছেন।

 

তারা সর্বসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যালট গণনার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশসমূহের একটি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আন্তর্জাতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

 

দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে তা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বা নীতিমালার ওপর প্রভাব ফেলে না, বরং তা বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

 

এই কারণে ভোট গণনার সংবেদনশীল সময়ে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

 

ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্রগুলো এখন গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে যে, কীভাবে আসন্ন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়।

 

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সংবিধানের সঠিক প্রয়োগই এই সম্ভাব্য সংকট থেকে মার্কিন সমাজকে রক্ষা করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা মন্তব্য করেছেন। সর্বোপরি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠীর সম্ভাব্য তৎপরতা এবং ভোটারদের মনে সন্দেহ সৃষ্টির অপপ্রয়াস মোকাবিলা করাই এখন মার্কিন নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

 

প্রতিটি ভোট গণনার কাজ যেন শতভাগ সততা, পেশাদারিত্ব এবং আইনি বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য প্রশাসন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। এই বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভুয়া খবরের দৌরাত্ম্য থামানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও মার্কিন নির্বাচনের এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে, কারণ একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও কারচুপিমুক্ত নির্বাচনি ফলাফলের ওপরই যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি নির্ভর করছে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান