সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসনের জারি করা একটি নতুন নির্বাহী আদেশের পর থেকে সরকারি কাজে ‘এআই’-এর পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এসআই’ শব্দটি ব্যবহার করার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এই বিশেষ নির্দেশনার ফলে এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বিভাগ, সংস্থা, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রে এই নতুন পরিভাষা বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে হবে।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এই নতুন নামকরণ ও পরিভাষা পরিবর্তনের কারণে পূর্ববর্তী কোনো সরকারি নিয়ম, সম্পাদিত চুক্তি, সরকারি অনুদান বা অতীতে সংরক্ষিত পুরোনো নথিপত্রের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা প্রভাব পড়বে না।
অর্থাৎ শুধুমাত্র বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন এই পরিভাষাটি কার্যকর থাকবে। এই অভিনব নামকরণের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে যে, গত সাত দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উন্নত ও বিকশিত হয়েছে।
বর্তমান যুগের এই আধুনিক প্রযুক্তির সক্ষমতা ঐতিহ্যগত বা প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে। আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আজকের আধুনিক প্রযুক্তি কেবল মানুষের বুদ্ধিমত্তার কিছু নির্দিষ্ট কাজ অনুকরণ বা স্বয়ংক্রিয় করাই সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং এটি মানবজাতির চিন্তা করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং নানাবিধ উদ্ভাবনী শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির বিভিন্ন জটিল ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। তাই মার্কিন প্রশাসনের মতে, সরকারের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত পরিভাষার মধ্যেও এই প্রযুক্তির প্রকৃত সক্ষমতা এবং অগ্রগতির চিত্রটি সঠিকভাবে ফুটে ওঠা উচিত।
নতুন এই আদেশের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার আপাতত দেশটির প্রচলিত আইনের ১৫ নম্বর শিরোনামে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পুরোনো সংজ্ঞাটিই ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে।
পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহকারীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ প্রযুক্তির জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি সরকারি সংজ্ঞা তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেশের কংগ্রেসে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যমান মার্কিন আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও পরিবর্তনের উপযুক্ত সুপারিশও পেশ করতে বলা হয়েছে। এই নির্বাহী আদেশ জারির ঠিক আগে হোয়াইট হাউসে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
সেই বৈঠকে স্পেসএক্স ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই এবং এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংসহ প্রযুক্তি জগতের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
সেই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এই নবীন প্রযুক্তির অভাবনীয় ও দ্রুত অগ্রগতিকে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি অভূতপূর্ব নতুন যুগের শুভ সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রযুক্তি খাতের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব তুলে ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোরালোভাবে মন্তব্য করেন যে, এটি মানব ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী বিষয়-যা সম্ভবত সর্বকালের সর্ববৃহৎ অর্জন।
তিনি আরও বলেন যে এই প্রযুক্তি ঐতিহাসিক ইন্টারনেট আবিষ্কারের চেয়েও অনেক বেশি বিশাল এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির জন্য একটি অসাধারণ মাইলফলক। ঐতিহাসিক ওই বৈঠকের পর প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহী এবং মার্কিন প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান যে, ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ প্রযুক্তি যেন সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে বিকশিত হতে পারে, সেই লক্ষ্যে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
এই বিষয়ে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, তারা আমেরিকার সাধারণ জনগণ এবং তাদের মূল্যবান গ্রাহকদের এই সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে চান যে, এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সর্বদা মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সঠিক ও নিরাপদ উপায়ে কাজ করবে।
এছাড়া অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডি নিজের বক্তব্যে বলেন যে, অত্যন্ত নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, দেশের মহামান্য প্রেসিডেন্ট এবং বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করলে এই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মানবকল্যাণমুখী রাখা সম্ভব হবে। পুরো এই আলোচনা ও প্রক্রিয়ায় দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জে ক্লেটন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব বজায় রাখা বর্তমান সময়ে জাতীয় নিরাপত্তার সুরক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক বিষয়।