বুধবার ওয়াশিংটনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপে খুব শীঘ্রই বড় আকারের ভূগর্ভস্থ জরিপ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী অনুসন্ধান কার্যক্রমের নির্দিষ্ট সময়সূচি, অর্থায়নের উৎস কিংবা এতে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সরাসরি যুক্ত থাকবে-সেই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা এখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সম্পদ আহরণের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন জ্বালানি বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে সহজে উত্তোলনযোগ্য খনিজ তেলের যে সুবিশাল মজুত রয়েছে, তা বর্তমান বিশ্বের প্রায় যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময়।
ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে সুদীর্ঘকাল ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বাণিজ্যিক নীতিমালার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডটি।
তবে এবার খনিজ তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি বিরল খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ওয়াশিংটন যে কতটা তৎপর, তা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে পুনরায় স্পষ্ট হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আর্কটিক অঞ্চলের চরম বৈরী আবহাওয়া এবং পরিবেশগত সুরক্ষার কঠিন আন্তর্জাতিক নিয়মের কারণে এমন অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বাস্তবে রূপ দেওয়া অত্যন্ত জটিল হতে পারে।
তবুও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য পুরো উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এদিকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের মধ্যেই নিজের বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত আকাশসীমাকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সুরক্ষায় এক নজিরবিহীন ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক সুদীর্ঘ বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ভবিষ্যতে যদি বৈরী কোনো পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আকাশপথে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালাতে চায়, তবে সেই আঘাতের পথকে অবশ্যই গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়েই অতিক্রম করতে হবে।
এই প্রতিরক্ষা সমীকরণ তুলে ধরে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেখানে তাদের চৌকস প্রতিরক্ষা বাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। যেকোনো আগ্রাসী ড্রোন, আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা প্রযুক্তিগতভাবে মানবজাতি এখনও কল্পনাও করতে পারেনি-এমন যেকোনো ধরনের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এই দ্বীপের আকাশসীমায় প্রবেশ করামাত্র মার্কিন সামরিক বাহিনী অত্যন্ত কঠোরভাবে তা মাঝপথেই ভূপাতিত ও ধ্বংস করবে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই সুবৃহৎ দ্বীপটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে অতীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার প্রকাশ্য মন্তব্য ও আগ্রহ আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করেছিল।
তাঁর পূর্ববর্তী অবস্থান এবং একের পর এক বক্তব্যের জেরে ওয়াশিংটন, কোপেনহেগেন ও নুকের মধ্যে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও স্থানীয় গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ও টানাপোড়েনের সূত্রপাত হয়।
সেই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসন ও পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যৌথ তাগিদ থেকেই গত সেপ্টেম্বর মাসে তিন পক্ষের মধ্যে একটি বহুপাক্ষিক ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। মূলত সেই কূটনৈতিক সমঝোতাই আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নতুন আইনি ভিত্তি এনে দিয়েছে।
গত মাসে স্বাক্ষরিত সেই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত ভূমিকা বহুলাংশে বৃদ্ধি করার এক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমঝোতার শর্তানুযায়ী, অঞ্চলটিতে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নতুন দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের আইনি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ও নিজস্ব পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এই বরফাবৃত ভূখণ্ডে কার্যকরভাবে গড়ে তোলার পথও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়েছে। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু হলে তা পুরো উত্তর গোলার্ধ জুড়ে ওয়াশিংটনের আগাম সতর্কবার্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সামরিক সম্প্রসারণের এই সমঝোতা সত্ত্বেও চুক্তির মূল নীতিমালায় ডেনমার্কের ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছেদ্য অধিকারকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে মার্কিন সামরিক কাঠামোর আধুনিকায়ন বা জ্বালানি অনুসন্ধান চালানো হলেও গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব ভূখণ্ডগত মর্যাদা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।
উত্তর আটলান্টিক ও সুমেরু অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ডের যে কৌশলগত অনন্য গুরুত্ব রয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ এই জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক পদক্ষেপ বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে সেই বাস্তবতাকে আরও একবার জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।