বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে হুতিরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে হুতিরা
ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ দেশ ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে তীব্র ক্ষোভ ও কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ও কঠোর বার্তায় তিনি এ সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এই ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

 

একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও হুঁশিয়ারিসূচক ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর এই চক্রান্তমূলক ঘটনা তিনি কোনো অবস্থাতেই ভুলে যাবেন না।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপির সূত্রে জানা গেছে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘস্থায়ী সংকট গত জুলাই মাসে এসে এক নতুন ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করে।

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের বৈধ সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষ সামরিক ও লজিস্টিক সমর্থন জুগিয়ে আসছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সামরিক জোট। অন্যদিকে, এই সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজধানী সানাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।

 

চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।

 

সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান গৃহযুদ্ধ পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত করে তুলেছে।

 

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন তেল শোধনাগার, তেল পাইপলাইন, লোহিত সাগরে চলাচলরত তেলবাহী বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রধান প্রধান পরিবহন অবকাঠামোগুলো তাদের অন্যতম মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

 

গত সপ্তাহের শেষের দিকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো এক প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এই ধরণের ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে জ্বালানি পরিবহন এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হুতিদের এসব সামরিক তৎপরতা নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষোভ ঝেড়েছেন।

 

তিনি তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন যে, হুতি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও নিন্দনীয় আচরণ প্রদর্শন করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী সম্ভবত তাদের আঞ্চলিক অভিভাবক ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও পরোক্ষ উসকানিতেই কাজ করে যাচ্ছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সশস্ত্র মিত্রদের মতো হুতিদের কর্মকাণ্ডও তেহরানের পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তাঁর লেখায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, আন্তর্জাতিক সমাজের কোনো নিয়মনীতির পরোয়া না করে সৌদি আরবের সার্বভৌম সীমানার অভ্যন্তরে একের পর এক হামলা চালানো কোনো স্বাভাবিক সামরিক আচরণ হতে পারে না।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর বিবৃতিতে অভিযোগের সুর আরও চড়িয়ে বলেন, হুতিরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যে নোংরা ও জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়া।

 

আর এই কাজটি তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করছে ঠিক সেই সময়ে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ্যনির্ধারণী মধ্যবর্তী নির্বাচন দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাকে তিনি কোনো সাধারণ বিষয় নয় বরং মার্কিন অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতাকে নাড়িয়ে দেওয়ার এক অপকৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 

হুতিদের সতর্ক করে দিয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত তির্যক ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে লেখেন, কোনো একজনের উচিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতাদের অবিলম্বে বুঝিয়ে বলা যে তিনি নিজে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না।

 

তবে নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, নির্বাচনের পরবর্তী সময়েও তিনি মার্কিন প্রশাসনের নেতৃত্বে স্বমহিমায় অবস্থান করবেন এবং এই দুঃসময়ে জ্বালানি নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যে ঘটনা ঘটছে, তা তিনি আজীবনেও বিস্মৃত হবেন না।

 

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ক্ষোভের পেছনে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং গভীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণ নিহিত রয়েছে। চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ খুচরা বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি গাড়িনির্ভর দেশে পেট্রল পাম্পে জ্বালানি কিনতে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি পণ্যের মূল্যস্ফীতিও রেকর্ড ছুঁয়েছে। এর ফলে সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 

মার্কিন রাজনীতির সমীকরণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া সবসময়ই ক্ষমতাসীন বা নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া মার্কিন ভোটারদের কাছে এখন জীবনযাত্রার এই আকাশচুম্বী ব্যয় সামাল দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ব্যালট বাক্সে গিয়ে সাধারণ মানুষ যখন তাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটের মূল্যায়ন করবেন, তখন জ্বালানির এই ঊর্ধ্বগতি সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত জিইয়ে রেখে এবং তেল স্থাপনায় আক্রমণ চালিয়ে হুতিরা আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করছে, যার পরোক্ষ মাশুল দিতে হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতিকে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ সুরক্ষিত রাখতে পরাশক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

 

- এএফপি