সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেক্সিকোতে পানির দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

মেক্সিকোতে পানির দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদশৈলী অনুসরণ করে মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর গুয়াদালাজারার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলে একটি ভয়াবহ মানবিক ও প্রশাসনিক সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। মেক্সিকোর এই ঐতিহাসিক ও জনবহুল শহরটিতে সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং সরবরাহকৃত পানির ভয়াবহ দূষণের প্রতিবাদে আয়োজিত সাধারণ নাগরিকদের বিক্ষোভ বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে।

 

বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান পানির দাবিতে রাজপথে নেমে আসা সাধারণ মানুষের এই যৌক্তিক আন্দোলন এক পর্যায়ে ভয়াবহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায় রূপ নেয়। গত রোববার শহরটিতে অনুষ্ঠিত এই বিশাল জনসমাবেশটি ছিল মূলত গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিজেদের নাগরিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বিতীয় বৃহৎ জনবিক্ষোভ।

 

তবে এবারের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটি হঠাৎ করেই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে যখন মুখোশধারী একদল অজ্ঞাত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সরকারি স্থাপনায় ধ্বংসাত্মক হামলা চালায়।

 

রাজ্য কংগ্রেস ভবনের প্রবেশপথে শক্তিশালী বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটানো এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অগ্নিসংযোগের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই বহিরাগত দলের বিরুদ্ধে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো মেক্সিকোতে সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার, পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এক নতুন সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে।

 

গুয়াদালাজারা মহানগর এলাকা এবং এর আশেপাশের বিস্তীর্ণ জনপদের সাধারণ বাসিন্দারা গত কয়েক বছর ধরেই বিশুদ্ধ ও নিরাপদ ব্যবহারযোগ্য পানির চরম অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে আসছেন।

 

স্থানীয় নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সরকারিভাবে স্থাপিত কলগুলোতে অধিকাংশ সময়ই কোনো পানি সরবরাহ থাকে না। আর দৈবাৎ যখনই বা পানি আসে, তা ব্যবহারের সম্পূর্ণ অযোগ্য; অত্যন্ত কালো, কাদাটে এবং উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত।

 

এই মাত্রাতিরিক্ত দূষিত পানি সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে, যা নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চরম অসন্তোষ বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা চলতি মাসের শুরুর দিকে জলিসকো রাজ্যের শীর্ষ কর্মকর্তা ও গভর্নর পাবলো লেমুসের একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য বক্তব্যেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

 

তিনি এই সুপেয় পানির সংকটকে পুরো রাজ্যের ইতিহাসের এক ‘নজিরবিহীন’ বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। একই সময়ে রাজ্যের জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন কর্তৃপক্ষের পরিচালিত একাধিক নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় স্থানীয় পানি সরবরাহব্যবস্থায় ক্ষতিকর ‘কলিফর্ম’ ব্যাকটেরিয়ার অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সরাসরি মানবদেহে কলেরা, ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের মতো নানা পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম, যা এই সংকটের মাত্রাকে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর, অস্বাস্থ্যকর ও চরম হতাশাজনক পরিস্থিতিতে নিজেদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার আদায়ের তাগিদে গত রোববার রাজপথে নেমেছিলেন শহরের হাজার হাজার সাধারণ ও ভুক্তভোগী নাগরিক।

 

কিন্তু তাদের এই অধিকার আদায়ের নিয়মতান্ত্রিক ও সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের একপর্যায়ে মুখোশ পরিহিত কয়েকজন দুষ্কৃতকারীর অনুপ্রবেশ এবং তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডে পুরো পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যেই উত্তপ্ত ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ এবং বিক্ষোভের মূল আয়োজক কমিটির প্রাথমিক ধারণা, মূলত এই শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত ও সহিংসতা উসকে দিতেই একটি সংঘবদ্ধ বহিরাগত চক্র সাধারণ মানুষের ভিড়ে অত্যন্ত সুকৌশলে মিশে গিয়েছিল।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ওই মুখোশধারী ব্যক্তিরা ভারী হাতুড়ি, প্রাণঘাতী পেট্রলবোমা এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আতশবাজি বহন করছিল।

 

এই আকস্মিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকার দোকানপাটে ব্যাপক লুটপাট এবং নির্বিচারে ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের এবং পথচারীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

 

তবে এই পুরো ঘটনায় অত্যন্ত ইতিবাচক ও লক্ষণীয় বিষয় হলো, পানির দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ নাগরিক ও সচেতন সিভিল সোসাইটির সদস্যরা এই ধ্বংসাত্মক ও মুখোশধারী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিতে অত্যন্ত কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানান।

 

সচেতন বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, যারা পেট্রলবোমা বা হাতুড়ি নিয়ে এই ধরনের সহিংসতা ও নাশকতা চালাচ্ছে, তারা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের এই যৌক্তিক দাবির অংশ নয়।

 

পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সহিংসতায় সরাসরি জড়িত এই বহিরাগত ব্যক্তিদের মূল দল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বের করে না দেওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিবাদ মিছিল সামনের দিকে এক পা-ও এগিয়ে নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

 

পরবর্তীতে জলিসকো রাজ্যের গভর্নর পাবলো লেমুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে এই ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শুরুতে একদল সহিংস ও উগ্র ব্যক্তি সাধারণ মানুষের এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

 

তবে এই বিক্ষোভের পেছনে থাকা বেসামরিক ও সাধারণ আয়োজকেরা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তাদের খুব দ্রুত শনাক্ত করে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেদের মূল মিছিল থেকে সম্পূর্ণভাবে বের করে দেন।

 

রাজ্য কংগ্রেস এবং বিচার বিভাগের ভবনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর সরকারি স্থাপনার প্রবেশপথে এই বর্বরোচিত অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে অত্যন্ত কঠোর ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে।

 

পুলিশি ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই পরিকল্পিত নাশকতার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার সুস্পষ্ট ও প্রাথমিক সন্দেহে একটি চুরি করা পিকআপ ভ্যানে থাকা পাঁচজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে।

 

তল্লাশি চালিয়ে ওই গাড়িটি থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল বা পেট্রলভর্তি বেশ কয়েকটি পাত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা এই হামলার পেছনে একটি গভীর পূর্বপরিকল্পনারই অত্যন্ত স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আটককৃতদের রিমান্ডে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই হামলার পেছনের মূল ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে প্রশাসন।

 

মেক্সিকোর এই ঐতিহ্যবাহী শহরটিতে সুপেয় পানির দাবিতে সাধারণ মানুষের এমন সংঘবদ্ধ ও তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবারই প্রথম নয়। এর মাত্র কয়েকদিন আগে, গত এগারোই অক্টোবর গুয়াদালাজারা শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিষ্কার পানির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ‘মার্চ ফর ওয়াটার’ বা পানির জন্য পদযাত্রা নামক একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

স্থানীয় সূত্রগুলোর ও গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান মতে, সেই অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভে সমাজের সর্বস্তরের দশ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিশাল ওই জনসমুদ্রের কারণে সেদিন পুরো শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও যানচলাচল কার্যত থমকে গিয়েছিল।

 

পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে-এমন আশঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসন সেদিন পুরো এলাকাটিতে বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা দমন পুলিশ এবং দমকলকর্মীদের মোতায়েন করেছিল।

 

অত্যন্ত নির্মম ও মর্মান্তিক একটি অভিযোগ সেদিন উঠেছিল প্রশাসনের বিরুদ্ধে; যে মানুষগুলো মাসের পর মাস এক ফোঁটা পরিষ্কার পানির জন্য হাহাকার করছে, সেই তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সেদিন জলকামান থেকে বিপুল পরিমাণ পরিষ্কার ও সুপেয় পানি ব্যবহার করেছিল, যা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দেয় এবং পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।

 

প্রথম বিশাল বিক্ষোভটি শেষ পর্যন্ত আর শান্তিপূর্ণ থাকেনি; বরং তা ভয়াবহ পুলিশি নির্যাতনের এক কালো ও নিন্দনীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। নির্ভরযোগ্য মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেই দিনের সংঘাত ও পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে অন্তত সাতান্নজন সাধারণ নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন এবং ঘটনাস্থল থেকে উনচল্লিশজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সেদিনের বিক্ষোভে কেবল সাধারণ মানুষই নয়, বরং পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর ওপরও পুলিশ অত্যন্ত নির্মমভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছিল বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

 

এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে প্রশাসন অন্তত সতেরোজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক আইনি কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হয়।

 

শুধু তা-ই নয়, সেদিন পুলিশের হাতে আটক হওয়া অনেক ব্যক্তি পরবর্তীতে হেফাজতে থাকা অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন এবং চরম অবমাননাকর আচরণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগও উত্থাপন করেছেন, যা মেক্সিকোর বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি অন্ধকার দিককেই গোটা বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে।

 

- আনাদোলু