প্রেসিডেন্ট পেত্রোর শাসনামলের প্রথম দিকে যে ফার্স্ট লেডিকে প্রায়শই জনসমক্ষে দেখা যেত, সেই ভেরোনিকা আলকোসের গত কয়েক মাস ধরে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কার্যত অনুপস্থিত। প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস ‘কাসা দে নারিনো’-তে তার জন্য নির্ধারিত দপ্তর থাকলেও, সেই চেয়ারটি বেশিরভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকে। কিন্তু তার এই দেশীয় অনুপস্থিতির ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তিনি কলম্বিয়া রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন উচ্চ-পর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, যার ব্যয়ভার বহন করা হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে।
এই বৈসাদৃশ্যটি প্রথম জনসমক্ষে বিস্ফোরিত হয় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার ফার্স্ট লেডি ভেরোনিকা আলকোসেরকে কুখ্যাত ‘ক্লিনটন লিস্ট’-এ (মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ওফ্যাক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত একটি নিষেধাজ্ঞা তালিকা) অন্তর্ভুক্ত করে। রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে তিনি অন্যায় সুবিধা গ্রহণ করেছেন, এমন অভিযোগেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই একই তালিকায় প্রেসিডেন্টের পুত্র নিকোলাস পেত্রো বুর্গোস এবং মন্ত্রী আরমান্দো বেনেদেত্তির নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা পেত্রো প্রশাসনের ওপর ব্যাপক মার্কিন চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্লিনটন লিস্টে অন্তর্ভুক্তির পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মার্কিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হয়, ব্যবসায়িক লেনদেন স্থগিত হয়ে যায় এবং কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে কার্যত একঘরে হয়ে পড়তে হয়। এই আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখেই প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সম্প্রতি এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বোমা ফাটান। তিনি বলেন, "আমরা বছরের পর বছর ধরে আলাদা থাকছি।" এই স্বীকারোক্তিটি ছিল মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে ফার্স্ট লেডিকে রক্ষা করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা-যাতে প্রমাণ করা যায় যে, রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে তার আর কোনো ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ নেই, যার মাধ্যমে তিনি সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের এই স্বীকারোক্তি বিতর্ক কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তার ‘বিচ্ছেদ’ ঘোষণার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমত, পেত্রো এবং আলকোসের আইনগতভাবে এখনও বিবাহিত। দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, পেত্রোর সাথে বসবাস না করলেও, ভেরোনিকা আলকোসের ‘ফার্স্ট লেডি’র ভূমিকা পালন করা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি সম্প্রতি ইউরোপে চলে গেলেও, দেশে ফিরে আসার পর এখনও "ব্যতিক্রমী" রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল পাচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় প্রমাণটি সামনে এনেছেন ডেমোক্র্যাটিক সেন্টার পার্টির কাউন্সিলম্যান ড্যানিয়েল ব্রিসেনো। তিনি ২০২৪ সালের ১ নভেম্বরের (অর্থাৎ, এই প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র কয়েক দিন আগের) একটি হলফনামা (sworn statement) প্রকাশ করেছেন, যেখানে প্রেসিডেন্ট পেত্রো নিজেই ভেরোনিকা আলকোসেরকে তার ‘স্ত্রী’ বা ‘জীবনসঙ্গী’ (spouse) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্রিসেনো এই নথি প্রকাশ করে সরাসরি প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, "পেত্রো হয় দেশের সাথে মিথ্যা বলছেন, নয়তো তিনি এই প্রতিবেদনে জালিয়াতি করেছেন।" এই হলফনামাটি পেত্রোর "বছরের পর বছর ধরে বিচ্ছেদ"-এর দাবিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রেসিডেন্টের সাথে ‘বিচ্ছেদ’ সত্ত্বেও ভেরোনিকা আলকোসেরের আন্তর্জাতিক সফরের তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল, যার পুরোটাই কলম্বিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে করা হয়েছে। প্যারিস অলিম্পিক (মধ্য-২০২৪): প্রেসিডেন্ট পেত্রোর সাথে এটিই ছিল তার শেষ জনসমক্ষে আসা আন্তর্জাতিক সফর। এই সফরে তিনি কলম্বিয়ার প্রতিনিধি দলের সাথে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে এবং ফরাসি ফার্স্ট লেডির সাথে বৈঠকে অংশ নেন। প্যালেসের সূত্রমতে, এই সফরের সময়ই তাদের বিচ্ছেদ "প্রায় চূড়ান্ত" রূপ নেয়, যদিও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
মিশর: প্যারিস সফরের পরপরই, ফার্স্ট লেডি একাকী মিশর ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি মিশরের ফার্স্ট লেডি এনতিসার আমরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সফরের আলোচ্যসূচি ছিল সামাজিক সহযোগিতা, বালিকা শিক্ষা এবং শিশু অধিকার-সম্পূর্ণরূপে একটি রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা। সুইডেন: এরপর তিনি সুইডেনে বেশ কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করেন। সেখানে তিনি লিঙ্গ সমতা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ফাউন্ডেশনগুলোর সাথে বৈঠক করেন এবং সুইডিশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। এই দীর্ঘ অবস্থানকে তার "অস্থায়ী আবাস" হিসেবে জল্পনা শুরু হলেও, তার ঘনিষ্ঠজনেরা একে "মিশ্র" সফর (ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক কারণের মিশ্রণ) বলে দাবি করেন।
চীন (সেপ্টেম্বর ২০২৪): গত বছর সেপ্টেম্বরে তিনি চীন সফর করেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী এবং কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করেন। বেইজিং-এ অবস্থিত কলম্বিয়ার দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে, তিনি একটি "সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত এজেন্ডা"র অংশ হিসেবেই এই সফর করেন। মধ্যপ্রাচ্য (২০২৫-এর শুরুতে): চলতি বছরের শুরুতে, আলকোসের মধ্যপ্রাচ্যে অনুষ্ঠিত ‘অন্ধত্ব প্রতিরোধের বিরুদ্ধে গ্লোবাল ফোরাম’-এ যোগ দেন। সেখানে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রতিনিধিদের সাথে একই প্যানেলে আলোচনা করেন এবং কলম্বিয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য সামাজিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি নিয়ে কথা বলেন।
ভ্যাটিকান (এপ্রিল ২০২৫): তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক সফরটি ছিল এই এপ্রিলে। পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে তিনি কলম্বিয়ার সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এই সফরে তার সঙ্গী ছিলেন কলম্বিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরা সারাবিয়া। এটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত সফর ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব। এইসব সফরের খরচ নিয়েও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস থেকে ‘এল কলম্বিয়ানো’ পত্রিকাকে জানানো হয়েছে যে, "কিছু সময় ধরে" ফার্স্ট লেডি তার সফরের খরচ "নিজস্ব সম্পদ" থেকেই বহন করছেন।
তবে, সরকারি নথি ভিন্ন কথা বলে। প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট (Dapre)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে তার লন্ডন সফরের ভ্রমণ ব্যয় বাবদ ৭৪,৬৭৭,৭৩৬ কলম্বিয়ান পেসো সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যখন তিনি পোপ ফ্রান্সিসের সাথে দেখা করতে যান (শেষকৃত্যের আগের সফর), তখন তার দৈনিক ভাতা (per diem) বাবদ খরচ হয়েছিল ৪,৭৮৯,৯৯৫ কলম্বিয়ান পেসো। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই খরচের ধরণ অন্যান্য সফরের ক্ষেত্রেও পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলম্বিয়ার আইনে একটি বড় আইনি শূন্যতা বা ফাঁক (legal loophole) রয়ে গেছে। ফার্স্ট লেডি (বা ফার্স্ট জেন্টলম্যান) কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন, তাই তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি দায়িত্ব বা বেতন নেই। কিন্তু তারা তাদের পদের সুবাদে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, নিরাপত্তা এবং-যেমনটি দেখা যাচ্ছে-সরকারি তহবিল থেকে সফরের সুবিধাও ভোগ করেন।
ভেরোনিকা আলকোসেরের এই ঘটনাটি সেই আইনি শূন্যতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি তার স্ত্রীর সাথে "বছরের পর বছর ধরে বিচ্ছিন্ন" বলে দাবি করছেন, কীভাবে সেই স্ত্রী এখনও রাষ্ট্রীয় খরচে বিশ্বজুড়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন-এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর পেত্রো প্রশাসন এখনও দিতে পারেনি, যা কলম্বিয়ার জনগণের মধ্যে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।