মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর না ফেরার শর্তে পুলিশি পাহারায় চুয়েট ক্যাম্পাস ছাড়লেন অবরুদ্ধ উপাচার্য

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম

আর না ফেরার শর্তে পুলিশি পাহারায় চুয়েট ক্যাম্পাস ছাড়লেন অবরুদ্ধ উপাচার্য
ছবি : Collected

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে দীর্ঘ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে অবশেষে উদ্ধার করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এই উদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি অত্যন্ত কঠিন ও চূড়ান্ত শর্ত।

 

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এবং কঠোর পুলিশি পাহারায় তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ছিল, উপাচার্যকে কেবল একটি শর্তেই ক্যাম্পাস থেকে নিরাপদে বের হতে দেওয়া হবে, আর তা হলো তিনি ভবিষ্যতে আর কখনোই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন না।

 

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সৃষ্ট এই নজিরবিহীন ঘটনা শিক্ষাঙ্গনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।

 

তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ভবনের নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকা উপাচার্যকে যেকোনো মূল্যে নিরাপদে বের করে আনা। ক্যাম্পাসে পৌঁছে জেলা প্রশাসক গণমাধ্যম কর্মী ও সেখানে উপস্থিত শত শত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে পরিস্থিতি শান্ত করার বিনীত আহ্বান জানান।

 

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক ও উপাচার্য প্রশাসনের কাছে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন এবং শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

 

জেলা প্রশাসক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আরও বলেন, মূলত তাকে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান এবং হাসপাতালে ভর্তি করার মানবিক উদ্দেশ্যেই জেলা প্রশাসন তাকে উদ্ধার করতে এসেছে। প্রশাসনের এই ঘোষণার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

 

প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে দীর্ঘক্ষণ পর সন্ধ্যা ঠিক ৬টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রশাসনিক ভবন থেকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু ভবনের নিচে নামার পরপরই সেখানে এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়।

 

সেখানে অপেক্ষমাণ হাজারো বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী মুহূর্তের মধ্যে তাকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি হাতে একটি মাইক তুলে নেন এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনেই উপাচার্যের উদ্দেশে তাদের চূড়ান্ত শর্তটি ঘোষণা করেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচলিত কণ্ঠে বলেন, ‘উপাচার্যকে আমরা ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দিচ্ছি কেবল একটি মাত্র শর্তে, সেটি হলো তিনি আর কখনোই আমাদের এই পবিত্র চুয়েট ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন না।’ এ সময় ওই শিক্ষার্থীর ঠিক পাশেই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নির্বাক দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

 

শর্ত ঘোষণার পরপরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের গগনবিদারী ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। প্রবল জনরোষের মধ্য দিয়েই পুলিশি নিরাপত্তায় উপাচার্যকে একটি অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয় এবং দ্রুতগতিতে সেটি ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।

 

তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের ঠিক কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশাসন বা পুলিশের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।

 

চুয়েট ক্যাম্পাসে চলমান এই অচলাবস্থা ও উত্তেজনার সূত্রপাত বেশ কিছুদিন আগে হলেও, সোমবার সকালে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে তার পদে পুনরায় বহাল করা।

 

এই দাবির মধ্যেই সোমবার সকালে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম আকস্মিকভাবে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হন। শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, তিনি সম্পূর্ণ নিয়মবহিভূতভাবে এবং বহিরাগত কিছু অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের তালা জোরপূর্বক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।

 

সকাল পৌনে ৯টার দিকে তার এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের ক্লাস ও আবাসিক হল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এসে প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হন এবং উপাচার্যের অনতিবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে নিজেদের আন্দোলন আরও বহুগুণে বেগবান করেন।

 

ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাকে একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেন পদত্যাগ করার জন্য এবং কঠোর ভাষায় ঘোষণা দেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাকে ভবনের ভেতরেই অবরুদ্ধ করে রাখা হবে।

 

সেই ঘোষণার পর থেকেই তিনি নিজ কার্যালয়ে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে মঙ্গলবার সন্ধ্যার এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের মধ্য দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। মূলত উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই দেশের স্বনামধন্য এই প্রকৌশল বিদ্যাপীঠে এক দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

 

সাধারণ শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের মেয়াদ বৃদ্ধি বা তাকে পুনরায় নিয়োগের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন শুরু করেন। তাদের মতে, সাবেক উপাচার্যের সময়ে ক্যাম্পাসে যে একাডেমিক সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল, তা বজায় রাখতেই তাকে প্রয়োজন।

 

আন্দোলনের প্রথম দিনেই তারা উপাচার্য ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেন। এরপর থেকে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি দিন দিন আরও কঠোর হতে থাকে।

 

নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে মুখোশ মিছিল, চোখ বাঁধা প্রতিবাদ মিছিলসহ নানাবিধ অভিনব ও সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন।

 

কিন্তু প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের দাবির বিষয়ে কোনো ধরনের ইতিবাচক সাড়া না মেলায় একপর্যায়ে তারা নিরুপায় হয়ে ক্লাস ও সমস্ত পরীক্ষা বর্জন করার মতো কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।

 

শিক্ষার্থীদের এই সর্বাত্মক ধর্মঘটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়ে এবং পুরো ক্যাম্পাস এক ঘোরতর অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হয়। শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের সঙ্গে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্মতা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায় এবং আরও জটিল আকার ধারণ করে।

 

সোমবার সকালে নবনিযুক্ত উপাচার্যের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানায় চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি এবং স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন। এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সংগঠন সোমবারই যৌথমঞ্চ গঠন করে একটি জরুরি সভা আহ্বান করে এবং প্রশাসনের এমন স্বেচ্ছাচারী ও অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেয়।

 

শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই একযোগে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সমস্ত ধরনের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক কাজও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

 

একটি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এমন অভিন্ন ও সুদৃঢ় অবস্থান সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না, যা খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বর্তমান উপাচার্যের নিয়োগ ও কার্যকলাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই এক গভীর অসন্তোষ ও অনাস্থা বিরাজ করছিল।

 

বর্তমান এই থমথমে পরিস্থিতিতে চুয়েটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উপাচার্য চাপের মুখে ক্যাম্পাস ত্যাগ করলেও শিক্ষার্থীদের মূল দাবি এখনো পূরণ হয়নি এবং অচলাবস্থা কাটেনি।

 

সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই গভীর সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান, কার্যকর বা গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি। হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর মূল্যবান শিক্ষাজীবন যখন এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও কৃত্রিম অচলাবস্থার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা পরিস্থিতিকে কেবল দীর্ঘায়িতই করছে।

 

শিক্ষক ও কর্মচারীদের কর্মবিরতি এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কারণে চুয়েট ক্যাম্পাস এখন কার্যত একটি অচল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণে ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে এই সংকটের একটি সম্মানজনক ও সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান না এলে দেশের প্রকৌশল শিক্ষার এই অন্যতম সূতিকাগার অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক মহল গভীরভাবে মনে করছেন।

 

দেশের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ সুস্থ, স্বাভাবিক ও আন্তর্জাতিক মানের রাখতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রশাসনের কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।