শনিবার, ৪ জুলাই দুপুরে চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকেন্দ্র, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দেশের স্বাস্থ্যখাতে এই বিপুল জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকারের নতুন এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, শুধুমাত্র বড় বড় চিকিৎসাকেন্দ্র বা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে নজর দিলে সার্বিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব নয়।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা বা রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক ধাপগুলো যদি কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে দেশের আপামর জনসাধারণ সহজেই প্রাথমিক চিকিৎসা পাবে।
এর ফলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় ও বৃহত্তর চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ওপর থেকে সাধারণ রোগীদের মাত্রাতিরিক্ত ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। বর্তমানে ছোটখাটো স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও রোগীরা বড় হাসপাতালগুলোতে ভিড় করেন, যার ফলে গুরুতর রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান প্রায়শই ব্যাহত হয়।
নতুন এই এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত ও গুণগত ভারসাম্য ফিরে আসবে।
শুধুমাত্র অর্থের জোগান বা অবকাঠামোগত উন্নয়নই যে স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের একমাত্র সমাধান নয়, সে বিষয়টিও অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে মন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, স্বাস্থ্যখাতের কাঙ্ক্ষিত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধুমাত্র অর্থ বরাদ্দ বা আর্থিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়।
দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি আধুনিক ও কার্যকর রূপরেখার আওতায় এনে নতুনভাবে সাজাতে হবে, যাতে করে সেবার গুণগত মানের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। এই কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য তিনি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসক, চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পেশাজীবীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পেশাজীবীদের নিজ নিজ দায়িত্ববোধ এবং পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও সেবার মানসিকতাই পারে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও বেশি আস্থার ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে।
বর্তমান সরকারের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নীতির বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি জানান, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বর্তমানে বেশ কয়েকটি মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করছে।
এর মধ্যে প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা, জাতীয় পর্যায়ে তার অগ্রাধিকার, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য খাত হিসেবে স্বাস্থ্যখাতেও ঠিক একই ধরনের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় যেকোনো পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এই হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন যে, বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার ও স্বচ্ছতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেভাবে তাদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করেছে, সেই বৈশ্বিক সেরা চর্চা বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ এই মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগরপিতা চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিনসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও চিকিৎসা পেশায় যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
তাদের উপস্থিতিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর এই ঘোষণা চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সরকারের এই বিপুল জনবল নিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।