শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল- মির্জা ফখরুল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল- মির্জা ফখরুল
ছবি: সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য একটি দেশের শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

তিনি মনে করেন, রাজনীতিবিদেরা কখনোই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, বরং গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সমালোচনাই তাঁদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে। শুক্রবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের আনিসুল হক মিলনায়তনে নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথাগুলো বলেন।

 

পেশাদার সংবাদকর্মীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকেন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁরা সর্বদা চেষ্টা করেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ এলাকা ও সমগ্র দেশের যাবতীয় আর্থসামাজিক সমস্যার আন্তরিক সমাধান নিশ্চিত করতে।

 

তবে এই নিরলস ও বিশাল কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক সময় নীতিনির্ধারকদের অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি বা গৃহীত সিদ্ধান্তে মারাত্মক ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের প্রধান পেশাদার দায়িত্ব হলো নির্ভীকভাবে সেই ভুলগুলোকে জনসমক্ষে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা এবং জনপ্রতিনিধিদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা।

 

মির্জা ফখরুলের মতে, জনপ্রতিনিধিদের গঠনমূলক সমালোচনা করা সাংবাদিকতার একটি অবিচ্ছেদ্য, নৈতিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের নিগৃহীত হওয়ার রূঢ় বাস্তবতার কথাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

 

তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বর্তমান সমাজে অনেক সময় সত্য ঘটনা বা বস্তুনিষ্ঠ কোনো সংবাদ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন ভয়াবহ ও অগণতান্ত্রিক ঘটনা প্রায়শই ঘটলেও উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, একটি দেশের গণমাধ্যম যত বেশি শক্তিশালী, স্বাধীন ও ভয়হীন হবে, সে দেশের গণতন্ত্র ঠিক ততটাই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে। মূলত গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মাঝেই নিহিত রয়েছে একটি কার্যকর ও কল্যাণকামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত সাফল্য।

 

নিজ মন্ত্রণালয়ের দেশব্যাপী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিষয়েও বিস্তারিত কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে জানান, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে পূরণে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দুটি নতুন উপজেলার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে দাপ্তরিক কাজ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনের সার্বিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে।

 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই এসব নবগঠিত উপজেলায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হবে এবং নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তাঁদের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে শুধু ইট-পাথরের কাঠামোগত উন্নয়ন হলেই চলবে না, বরং সেখানে যেন সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে সেবা পায়, সে বিষয়েও স্থানীয় জনগণকে সজাগ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

 

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী তাঁর ঠাকুরগাঁও সফরের একটি মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতার কথা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তুলে ধরেন। শুক্রবার সকালে মোলানী এলাকায় প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটি এতিমখানা পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচশো শারীরিক ও মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া অসহায় শিশুকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে লালনপালন করা হচ্ছে।

 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ ও ক্ষোভের বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বিরোধী দল অর্থাৎ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার কারণে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত গত পনেরো বছর ধরে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের আর্থিক সাহায্য ও অনুদান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল।

 

এর ফলে চরম অর্থকষ্টে এতিমখানার টিনের ঘরগুলো জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং অবহেলিত ওই শিশুরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অমানবিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন।

 

পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় রোধে দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সমগ্র দেশকে মাদকমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, মাদকের ভয়াল ও সর্বনাশা থাবায় দেশের অসংখ্য তরুণ মেধাবী ছেলেমেয়ের সুন্দর জীবন ও ভবিষ্যৎ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা থেকে তাঁদের অবিলম্বে ও যেকোনো মূল্যে বের করে আনতে হবে।

 

সাংবাদিকদের পেশাদারত্ব ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, সংবাদকর্মীদের সর্বদা সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সৎসাহস ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।

 

সমাজে যাঁরা অন্যায়, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজ করবে, গণমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার হতে হবে; আবার যাঁরা দেশ ও দশের জন্য ভালো কাজ করবে, তাঁদের গঠনমূলক কাজের যথাযথ প্রশংসাও করতে হবে।

 

এ সময় এই গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী এবং ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের সভাপতি লুৎফর রহমান মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক তানভির হাসান তানুসহ স্থানীয় গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা।