এই দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, জটিল এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান এবং চলমান তৎপরতার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বুধবার, ১ জুলাই রাজধানীস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এই অবিচল আইনি ও কূটনৈতিক লড়াইয়ের রূপরেখা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় জানান যে, এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক বা নতুন কোনো হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার মতো না থাকলেও পুরো বিষয়টি একটি সুনির্দিষ্ট এবং ধারাবাহিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, একজন সাজাপ্রাপ্ত শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজ দেশের মাটিতে গুরুতর ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দণ্ডিত হওয়ার পর বর্তমানে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি যথেষ্ট জটিল, স্পর্শকাতর এবং সময়সাপেক্ষ।
তবে বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই সেই বিচারের রায় কার্যকর করার জন্য বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ আইনি ও কূটনৈতিক কূটকৌশল অবলম্বন করে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটি কেবল বর্তমান সরকারের একার কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণেরও এক প্রবল ও ন্যায়সঙ্গত দাবি। সাধারণ মানুষের সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
মতবিনিময় সভার দ্বিতীয় অংশে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে গত সতেরো বছর ধরে দেশের অর্থনীতিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
এর জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও তথ্যনির্ভর চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে যেসব অর্থ বিদেশের মাটিতে পাচার করা হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে বিশ্বের অন্তত দশটি প্রভাবশালী দেশের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র বা প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন। এটি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের একটি যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থ ফেরানোর এই আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার কাঠামোগত জটিলতাগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব দেশে বাংলাদেশের অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক আইন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত।
এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। শামা ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বীকার করেন যে, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার এই আইনি প্রক্রিয়া কোনোভাবেই রাতারাতি বা জাদুর মতো সম্পন্ন হওয়ার বিষয় নয়।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধৈর্যশীল ও সময়সাপেক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই। প্রতিটি অর্থের উৎস সন্ধান, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিদেশি আদালতের মাধ্যমে তা বাজেয়াপ্ত করার একটি নির্দিষ্ট দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে।
তবে এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যেও তিনি দেশবাসীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশার বাণী শুনিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করেন যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বর্তমানে যে উচ্চপর্যায়ের নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে, তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক।
এই আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে একধাপ এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের রক্তঘামে অর্জিত এবং পরবর্তীতে লুণ্ঠিত হওয়া সেই জাতীয় সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার যে সম্পূর্ণ সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে, সে বিষয়টি তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বারবার নিশ্চিত করেন।
পরিশেষে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আইনি ও কূটনৈতিক এই দ্বিমুখী লড়াই বর্তমান সরকারের একটি চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার সম্পূর্ণ ও সফল সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও মন্ত্রণালয় দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একযোগে কাজ করে যাবে।