মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, অন্তর্জাল বাজিতে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, অন্তর্জাল বাজিতে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে জাতীয় সংসদে নতুন ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ আমলের ১৮৬৭ সালের দেড়শ বছরের পুরোনো জুয়া আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত করা হলো।

 

আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রণীত এই আইনে অন্তর্জাল বাজি বা ডিজিটাল জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড এবং কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।

 

এর আগে গত ২৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়।

 

নতুন এই আইনের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধিবেশনে জানান, বিদ্যমান পুরোনো আইনটি বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক জুয়ার ভয়াবহতা মোকাবিলায় একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।

 

সংবিধানের নির্দেশনার পাশাপাশি ২০১৮ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও এই আইনটি যুগোপযোগী করে শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধির জোরালো সুপারিশ করা হয়েছিল। বর্তমানে অন্তর্জাল জুয়া, খেলার ফলাফল পূর্বনির্ধারণ বা ম্যাচ ফিক্সিং, সাংকেতিক মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক বাজি, নকল সিম ও মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার ভুয়া হিসাব ব্যবহার করে যে ধরনের প্রতারণা ও অর্থপাচার চলছে, তা দেশের তরুণ সমাজ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য সুরক্ষায় এই আধুনিক আইনটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে সরকার মনে করছে। বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই আইনে মোট চব্বিশ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

 

এর মধ্যে ডিজিটাল জুয়ার প্ল্যাটফর্ম, বৈদ্যুতিন অর্থথলি বা ডিজিটাল ওয়ালেট, প্রতিবিম্ব সাইট বা মিরর সাইট এবং ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের মতো আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় মোট চৌদ্দটি ভিন্ন ভিন্ন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এই আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে।

 

সাধারণ জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। তবে অন্তর্জাল বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

 

সবচেয়ে কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অন্তর্জালভিত্তিক বাজির ক্ষেত্রে, যেখানে অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের অর্থদণ্ড ভোগ করতে হবে।

 

খেলার মাঠে দুর্নীতি রোধেও আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।

 

অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা আজীবনের জন্য যেকোনো ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। শুধু জুয়া পরিচালনা নয়, বরং এর বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিচিতিমূলক বা অ্যাফিলিয়েট বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, অভিনয়শিল্পী বা প্রভাবশালীদের জন্যও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

 

আইনটিতে প্রযুক্তির আড়ালে থাকা অপরাধীদের ধরতে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রক্সি, হোস্টিং, ডোমেইন বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

নকল সিম ও বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে। জুয়ার অর্থ যেকোনো ব্যাংক বা মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে লেনদেন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিচালক বা ব্যবস্থাপকদেরও দায়ী করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। পুনরায় একই অপরাধ করলে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ হবে।

 

আইনের প্রয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে অন্তর্জালভিত্তিক জুয়া ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার এখতিয়ারসম্পন্ন ফৌজদারি আদালতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনের অধীন সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

তদন্তকার্যে স্বচ্ছতা আনতে সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। জনস্বার্থে সরকার বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জুয়া সংশ্লিষ্ট যেকোনো ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করার পূর্ণ ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।

 

ডিজিটাল প্রতারণা ও অর্থপাচার রোধে একটি জাতীয় ডেটাবেজ প্রণয়ন এবং আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে এই আইনটি দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এক নবদিগন্তের সূচনা করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।