সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

দেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও তীব্র পানি সংকট চিরতরে নিরসনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে বহুল আলোচিত 'তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

সোমবার জাতীয় সংসদে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী ভাষণে তিনি এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কথা দেশবাসীর সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের এই পদক্ষেপ একটি বিশাল মাইলফলক।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুন সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

অত্যন্ত উৎসবমুখর ও গঠনমূলক এই অধিবেশনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের সার্বিক অর্থনীতি, রাজস্ব নীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রূপরেখা নিয়ে বিস্তর ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন। তবে পুরো অধিবেশনে তার বক্তব্যের অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় দিক ছিল উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত তিস্তা নদীকে ঘিরে নেওয়া সরকারের এই বৃহৎ মহাপরিকল্পনার ঘোষণা।

 

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষা ও তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য।

 

এটি কেবল একটি সাধারণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং পুরো উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক মুক্তির একটি অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জেলাগুলো-বিশেষ করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদ তিস্তা নদীর পানি প্রবাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

কিন্তু ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তীব্র আকাল দেখা দেয় এবং বিপরীতদিকে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যা ও মাত্রাতিরিক্ত নদীভাঙনের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, ফসল ও সম্পদ প্রতিনিয়ত চরম হুমকির মুখে পড়ে।

 

সম্পূর্ণরূপে কৃষিনির্ভর এই বিস্তীর্ণ জনপদের সাধারণ কৃষকরা পর্যাপ্ত সেচের অভাবে প্রতি বছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

 

উত্তরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর নাব্যতা রক্ষা, সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং নদীভাঙন রোধে একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জোর দাবি জানিয়ে আসছিল।

 

সরকারের এই সময়োপযোগী ঘোষণা তাদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে এবং এক নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে প্রবল আশাবাদ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করতে এ ধরনের সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো পরিকল্পিতভাবে নদী খনন, বিজ্ঞানসম্মতভাবে নদীর তীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের জন্য সারা বছর পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।

 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার এই অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা লাঘবে কতটা সংবেদনশীল ও আন্তরিক।

 

বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও যেকোনো মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, তা সরকারের প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অর্থনৈতিক ও পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই বৃহৎ মহাপরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সার্বিক অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

 

কৃষি উৎপাদন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বহুমুখী নতুন কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

 

পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায়ও এই পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করবে। জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এই অটল প্রতিশ্রুতি শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের মনেই স্বস্তির সঞ্চার করেনি, বরং সমগ্র জাতির কাছে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম উন্নয়নের শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

 

এখন দেশের আপামর জনসাধারণের দৃষ্টি থাকবে এই ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনার দ্রুত, কার্যকর ও শতভাগ স্বচ্ছ বাস্তবায়নের দিকে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে এক অবিনশ্বর মাইলফলক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।