এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং সংবাদকর্মীসহ অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার তীব্রতায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, যা সাধারণ যাত্রী এবং স্থানীয় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতা দুপুরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এক বিভীষিকাময় পরিবেশের জন্ম দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের মহেশ্বরদী মৌজার ১১টি গ্রাম এবং মানিকদহ ইউনিয়নের পুখুরিয়া মৌজার ৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল।
এই বিরোধের সূত্রপাত মূলত গত শনিবার সন্ধ্যায় পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে মহেশ্বরদী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কালাম নামের এক ব্যক্তিকে মারপিট করার ঘটনার মাধ্যমে। এই ঘটনার জের ধরে রোববার সকাল ৭টার দিকে মহেশ্বরদী এলাকার ক্ষুব্ধ লোকজন পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষের সূচনা হয়।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এই সংঘাত চরম আকার ধারণ করে এবং উভয় পক্ষের হাজারো মানুষ দেশীয় অস্ত্র, ইট-পাটকেল এবং রেললাইনের পাথর নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। সংঘর্ষকারীরা বেশ কয়েকটি দোকানপাট ভাঙচুর এবং লুটপাটের সঙ্গেও জড়িত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পুখুরিয়া এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যাত্রীবাহী বাস ও যানবাহন আটকা পড়লে নারী, শিশুসহ সাধারণ যাত্রীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটান।
সংঘর্ষের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরুতে হিমশিম খায়। ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের জানিয়েছেন, বিকেল ৩টা পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ৩০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
এর মধ্যে ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহত ৩ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আহতদের তালিকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল তার প্রমাণ দেয়।
ভাঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজোয়ান দিপু এবং ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের তিন এসআই শাহ আলম, মিজানুর রহমান ও মো. আসাদ এবং চার কনস্টেবল সালাউদ্দিন, রাজীব, নাসিব ও মো. কামরুল চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন এবং দৈনিক ইত্তেফাক, সমকাল ও যুগান্তর পত্রিকার প্রতিনিধিরাও আহত হয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাতটি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। কিন্তু পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব এবং আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি বাহিনী পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে মহাসড়কে পুনরায় যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সংঘর্ষে উস্কানিদাতা ও জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে এলাকায় বর্তমানে শান্ত ভাব বজায় থাকলেও জনমনে এখনো চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।