রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেট ও কুমিল্লা জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

সিলেট ও কুমিল্লা জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ
ছবি: সংগৃহীত

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি জেলা সিলেট ও কুমিল্লায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

 

রোববার, ২৮ জুন, সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ রদবদলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে জেলা প্রশাসক পদটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা মাঠপর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আইনশৃঙ্খলারক্ষা, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তদারকি এবং জনগণের প্রত্যক্ষ সেবাপ্রদানের মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

 

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সিলেট ও কুমিল্লার মতো অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুই জেলায় এই নতুন নিয়োগ প্রশাসনিক অঙ্গনে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বরত মু. রেজা হাসানকে সিলেট জেলার নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি করা হয়েছে। মু. রেজা হাসান এর আগে কুমিল্লায় অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে তার যথেষ্ট পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

 

এখন তাকে পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত এবং প্রবাসী অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ সিলেট জেলার প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হলো। অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে কর্মরত থাকা রোজী আকতারকে পদায়ন করে কুমিল্লা জেলার নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

 

কুমিল্লার মতো একটি বৃহৎ ও আর্থসামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক পদে এমন একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি সরকারের প্রশাসনের একটি ইতিবাচক দিক। খুব শিগগিরই এই দুই কর্মকর্তা তাদের নতুন কর্মস্থলের দায়িত্বভার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে।

 

সিলেট জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি প্রশাসনিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটু বেশিই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মূল কারণ হলো এই পদটির সাম্প্রতিক শূন্যতা এবং পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসকের আকস্মিক প্রত্যাহার।

 

এর আগে, গত ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অপর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে তার পদ থেকে হঠাৎ করেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তার এই প্রত্যাহারের পর থেকেই সিলেট জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদটি শূন্য অবস্থায় ছিল।

 

একটি জেলার সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন একটি পদ বেশিদিন শূন্য রাখা যায় না বিধায় সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে নতুন একজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করেছে। সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং কৌতূহলের সৃষ্টি করেছিল।

 

মূলত সিলেটের ঐতিহাসিক এবং পবিত্র দুটি স্থান-হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং তহবিলের স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য তিনি একটি যুগান্তকারী ও সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

 

যুগ যুগ ধরে এই পুণ্যস্থানগুলোতে দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের দেওয়া অনুদান ও বিপুল পরিমাণ তহবিলের ওপর জেলা প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন সারওয়ার আলম।

 

তার এই উদ্যোগের কারণে তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, তেমনি অন্যদিকে বিভিন্ন মহলের নানা ধরনের চাপের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এমনকি বিদায়ের আগে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তার সততার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

 

মাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, ‘১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েও আমাকে কেনা সম্ভব নয়।’ জনস্বার্থে এমন একটি সংবেদনশীল এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ার পরপরই তার এই আকস্মিক প্রত্যাহারের ঘটনা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিলেও, প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি নিয়মিত রদবদল বা বদলি প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

এখন নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে মু. রেজা হাসানকে সিলেটে এমন একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হচ্ছে, যখন সেখানে মাজারকেন্দ্রিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং তহবিলের স্বচ্ছতার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পর্যায়ে রয়েছে।

 

পূর্বসূরির রেখে যাওয়া সেই অসমাপ্ত কাজ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি তিনি কীভাবে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেবেন, সেদিকে এখন সবার বিশেষ নজর থাকবে। পাশাপাশি প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, চা বাগান শ্রমিকদের অধিকার এবং পর্যটন খাতের সার্বিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

 

অন্যদিকে, কুমিল্লার নতুন জেলা প্রশাসক রোজী আকতারের জন্যও নতুন কর্মস্থলের দায়িত্বটি একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং কৃষিখাতে কুমিল্লা জেলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

 

প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে এই বৃহৎ জেলার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজলভ্য ও দুর্নীতিমুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সফল হবেন, তা নির্ভর করবে তার প্রশাসনিক দূরদর্শিতার ওপর। সব মিলিয়ে, সরকারের এই নতুন প্রশাসনিক রদবদল মাঠপর্যায়ে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, আগামী দিনগুলোতে সেটাই দেখার বিষয়।