শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্কুল কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে গাইবান্ধায় শিবির নেতা খুন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

স্কুল কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে গাইবান্ধায় শিবির নেতা খুন
ছবি: সংগৃহীত

কোনো রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব বা পূর্বশত্রুতা নয়, বরং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় প্রাণ হারিয়েছেন সাইফুল্লাহ বারী নামের এক ছাত্রশিবির নেতা।

 

গত রোববার বিকেলে সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক খুনের ঘটনা ঘটে। নিহত সাইফুল্লাহ বারী (২৪) বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং রংপুরের সাতগড়া মডেল কামিল মাদরাসার আল কুরআন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

 

এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার দেওয়া আগুনে অভিযুক্তদের বাড়ির পাশের তিনটি নিরীহ পরিবারের বসতঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

 

পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার মূল সূত্রপাত বোনারপাড়া সংলগ্ন কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। গত ১৬ জুন মনোনয়ন জমার শেষ দিনে সহকারী শিক্ষিকা রুমা আক্তারের স্বামী মাসুম কামালকে কমিটিতে রাখার জন্য প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ তারেকের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন স্থানীয় প্রভাবশালী জয়নাল আবেদীন ও জাহিদুল ইসলাম।

 

মাসুম কামাল একজন সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় প্রধান শিক্ষক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে অনুমতিপত্র দাবি করলে তাকে গালিগালাজ ও লাঞ্ছিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৮ জুন সাঘাটা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ওই প্রধান শিক্ষক।

 

থানায় অভিযোগ দায়েরের জেরে গত ২১ জুন দুপুরে বোনারপাড়া উপজেলা চত্বরের একটি চায়ের দোকানে প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহকে পেয়ে পুনরায় হেনস্তা করতে থাকেন যুবদল নেতা মোখলেছুর রহমান মুকুল ও তার সহযোগীরা।

 

প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ জানান, প্রতিপক্ষরা হিংস্রভাবে চড়াও হওয়ায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে তার ভাতিজা মোবাশ্বেরকে ডেকে পাঠান। মোবাশ্বের তার বন্ধু সাইফুল্লাহ বারী ও জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।

 

উপস্থিত লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নিবৃত্ত করে সরিয়ে দেন। কিন্তু এর মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট পরই মুকুল এবং তার ভাই পলাশ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পলাশের হাতের লোহার শাবলের আঘাতে সাইফুল্লাহর গলার এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়।

 

তাকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা সাধারণ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। এ সময় সালাউদ্দিন নামের আরেকজন ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। বর্তমানে সালাউদ্দিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

নিহতের বড় ভাই ফারুক আজম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সামান্য তর্কের সূত্র ধরে সম্পূর্ণ বিনা কারণে পরিকল্পিতভাবে তার নিরপরাধ ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। সাইফুল্লাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বোনারপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেন।

 

একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত মুকুলদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। কিন্তু সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের প্রবাসী সবুজ, পান ব্যবসায়ী এনামুল ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেলের বাড়িতে।

 

কোনো প্রকার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও আগুনে এই তিনটি পরিবারের নগদ অর্থ, আসবাবপত্র, গবাদিপশু ও শিক্ষার্থীদের বইখাতাসহ সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রবাসী সবুজের স্ত্রী জানান, ঋণ পরিশোধের জন্য পাঠানো পাঁচ লাখ টাকা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।

 

পান ব্যবসায়ী এনামুলের মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী রিনির সমস্ত বইপত্র পুড়ে যাওয়ায় তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২২ সদস্যের একটি দল প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্তনাদে এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

এ ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত মোখলেছুর রহমান মুকুলকে যুবদল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাঘাটা উপজেলা বিএনপি এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্থানীয় একটি বিরোধের জের, যার দায়ভার দল কোনোভাবেই নেবে না।

 

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আখ্যা দিয়ে আসামিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। নিহতের বাবা হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে ২১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

 

সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহাবুব আলম জানান, এজাহারভুক্ত আসামি আশরাফ খন্দকার, রবিউল ইসলাম, শাহ আলম ও মোফাজ্জল হোসেনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিশ্চিত করেছেন যে, আইনগতভাবে বিষয়টি তদন্তাধীন এবং নিরপরাধ কাউকে এই মামলায় অযথা হয়রানি করা হবে না। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রাথমিক ত্রাণ সহায়তা হিসেবে শুকনো খাবার প্রদান করা হয়েছে।