শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে নারী শ্রমিকের মৃত্যুর জেরে ব্যাপক বিক্ষোভ, পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

গাজীপুরে নারী শ্রমিকের মৃত্যুর জেরে ব্যাপক বিক্ষোভ, পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতের বিশাল কেন্দ্র গাজীপুর। এই জেলার শ্রীপুরে এক নারী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে চরম উত্তাল হয়ে উঠেছে স্থানীয় শ্রমিক সমাজ।

 

অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না দিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানোর কারণে লিজা আক্তার নামের ওই নারী শ্রমিকের অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শনিবার সকালে স্থানীয় কালার কো লিমিটেড কারখানার সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শত শত ক্ষুব্ধ শ্রমিক।

 

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে পুলিশ বাধ্য হয়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

 

স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, শনিবার, ২৭ জুন সকাল দশটার দিকে জেলার শ্রীপুর উপজেলার অন্তর্গত তেলিহাটি এলাকায় এই তীব্র অসন্তোষ ও শ্রমিক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। নিহত লিজা আক্তারের সহকর্মীরা সকাল থেকেই কারখানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন।

 

তাদের চোখেমুখে ছিল স্বজন হারানোর গভীর বেদনা এবং বুকে ছিল পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জমায়েত এক বিশাল প্রতিবাদী রূপ পরিগ্রহ করে। শ্রমিকরা একজোট হয়ে তাদের সহকর্মীর মৃত্যুর জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও নিষ্ঠুরতাকে দায়ী করে স্লোগান দিতে থাকেন।

 

সকাল সাড়ে দশটার দিকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক পুরোপুরি অবরোধ করে ফেলেন। এর ফলে ওই পথে সব ধরনের গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপের বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুল আলম গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, শনিবার সকালে তেলিহাটি এলাকায় অবস্থিত কালার কো লিমিটেডের বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে নিহত শ্রমিকের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে জোরদার আন্দোলন শুরু করেন।

 

একপর্যায়ে তারা আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকলে ব্যাপক জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।

 

কিন্তু বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে উল্টো চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং একপর্যায়ে পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলার চেষ্টা চালান। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

 

এর ফলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই শ্রমিক মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার থেকেই পুরো শিল্প এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং এর জেরে বেশ কিছু কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছিল।

 

এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শ্রীপুরে নারী শ্রমিকের মৃত্যুর জেরে আজও শ্রমিকরা তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন।

 

তারা শুধু সড়ক অবরোধই করেননি, বরং কারখানায় অনাকাঙ্ক্ষিত হামলারও চেষ্টা চালিয়েছেন। পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ হলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

 

বর্তমানে ওই এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আশ্বস্ত করেন যে, যে কারখানায় এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে এরই মধ্যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

 

উল্লেখ্য, গত বুধবার, ২৪ জুন দিবাগত রাতে শ্রীপুরের তেলিহাটি এলাকায় অবস্থিত ওই কালার কো লিমিটেড কারখানায় এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা হয়। সহকর্মীদের অভিযোগ, কারখানায় কর্মরত অবস্থায় নারী শ্রমিক লিজা আক্তার হঠাৎ করে মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা বোধ করেন।

 

তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার ছুটির আবেদন জানালেও তা নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তাকে জোরপূর্বক উৎপাদনের কাজে বাধ্য করা হয়। বিনা চিকিৎসায় এবং অমানবিক পরিশ্রমে ওই রাতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

 

এই মর্মান্তিক সংবাদ পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কারখানার অন্যান্য শ্রমিকের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে পুরো শিল্পাঞ্চলে শোক ও ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠে। সহকর্মীর এমন অমানবিক মৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ বন্ধ করে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন।

 

ক্ষোভের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আশপাশের একাধিক কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, বাধ্য হয়ে শিল্পাঞ্চলের অন্তত চারটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

একজন সাধারণ শ্রমিকের জীবনের মূল্যের চেয়ে কারখানার উৎপাদনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার যে ভয়ংকর অভিযোগ কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা দেশের সমগ্র শিল্পখাতের কর্মপরিবেশ ও মানবিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনাকে বারবার উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল শিল্পাঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে প্রত্যাশা করছেন সাধারণ শ্রমিকরা।