তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও জোরালো কণ্ঠে সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত রাষ্ট্রের সকল মৌলিক চুক্তি সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে বা অন্ধকারে রেখে কোনোভাবেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়।
একই সঙ্গে, দেশের সার্বিক জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে এই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ নীতির কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। শনিবার, ২৭ জুন জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের ওপর আনীত একটি ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
সংসদে এই ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই ধন্যবাদ প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার সুচিন্তিত বক্তব্যে বলেন, এই দেশ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবর্গের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, বরং এই দেশ আমাদের সব নাগরিকের।
দলমত নির্বিশেষে দেশের সার্বিক কল্যাণে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই এবং তার যথাযথ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চাই।
এ ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক বিরোধী দল হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের যেকোনো গঠনমূলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে তিনি সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে আশ্বস্ত করেন।
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল প্রকার মৌলিক ও কৌশলগত চুক্তি জাতীয় সংসদে নিয়ে আসার জোর দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, জাতীয় সংসদকে এড়িয়ে যেন রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গৃহীত না হয়।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে এই জাতীয় সংসদ। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হলে এবং এর ওপর উন্মুক্ত আলোচনা হলে সাধারণ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেগুলোর বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে বিশদভাবে অবগত হতে পারবেন।
এর মাধ্যমে সরকারের যাবতীয় কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং সরকার ও সাধারণ জনগণের মাঝে গণতান্ত্রিক আস্থার এক সুদৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেছেন, উভয় রাষ্ট্রকেই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত ও অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি আমদানিনির্ভর দেশ।
বিশ্ববাজারে আমাদের যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পরিমাণ পণ্য আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান রপ্তানি খাতের মূল ভিত্তি মূলত দুটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ-তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিদেশে কর্মরত জনশক্তি রপ্তানি।
তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে এবং অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে হলে এই রপ্তানি খাতকে আরও বেশি বহুমুখী করার যথেষ্ট সুযোগ আমাদের সামনে উন্মুক্ত রয়েছে।
এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত সুচিন্তিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সুদূরপ্রসারী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে জাতীয় অর্থনীতির এই অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনায় রেখেই ওই দুটি বন্ধুপ্রতিম দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তি সম্পন্ন করেছেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বারবার উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তি বা সাধারণ রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক হতে হবে সম্পূর্ণ পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য কোনো বাইরের শক্তি বা রাষ্ট্র অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করবে, এটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা কখনোই মেনে নেব না। যেকোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রেই সবার আগে দেশের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে হবে।
কোনো চুক্তি বা আন্তর্জাতিক সমঝোতা, তা হতে হবে সম্পূর্ণ পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আমরা যেমন অন্য কোনো রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না, ঠিক তেমনি নিজেদের জাতীয় স্বার্থও বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হতে দিতে চাই না।
এই ভারসাম্য অত্যন্ত সুচারুভাবে রক্ষা করেই যেন আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে তিনি সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। পরিশেষে, জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতির অবসান ঘটিয়ে এক নতুন, সহনশীল ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, দেশের রাজনীতিতে এমন একটি নেতিবাচক রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারি দল সবসময় সকল ইতিবাচক কাজের একচেটিয়া কৃতিত্ব নিজেদের বলে দাবি করবে এবং বিরোধী দল কেবল সমালোচনার খাতিরে সরকারের সবকিছুতে অন্ধভাবে বিরোধিতা করবে।
ব্যক্তিগত ও দলগত অবস্থান থেকে তারা এই অস্বাস্থ্যকর ও সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মোটেও সমর্থন করেন না বলে তিনি সংসদকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তার মতে, একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশে সরকারি দলকে অবশ্যই বিরোধী দলের গঠনমূলক মতামতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
একইভাবে, বিরোধী দলেরও পবিত্র দায়িত্ব থাকবে কেবল রাজপথে বা সংসদে অন্ধ বিরোধিতা না করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও দেশ গঠনে নিজেদের অবস্থান থেকে অত্যন্ত গঠনমূলক ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করা।