রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০১:০৫ পিএম

সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

 

একই ঘটনায় যুক্ত থাকার অপরাধে রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

 

রোববার, ২৮ জুন দুপুরে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়, যা দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের জন্য একটি কঠোর আইনি বার্তা প্রদান করা হয়েছে।

 

রোববার দুপুর বারোটা পঁচিশ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এই রায়টি ঘোষণা করেন।

 

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে সকাল এগারোটা আটচল্লিশ মিনিট থেকে বিচারিক কার্যক্রম এবং রায় পড়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

 

শুরুতে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দায়গুলো আদালতে পড়ে শোনান। পরবর্তীতে বিচারক মোহিতুল হক এনাম চার্জ বা অভিযোগ গঠন সংক্রান্ত বিস্তারিত অংশ পাঠ করেন এবং সর্বশেষে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

 

এই বিচারকার্যটি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। কারণ, জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

 

এই বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রায় ঘোষণার কার্যক্রমটি সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম আদালতের কাছে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দেশবাসীকে সরাসরি দেখানোর জন্য সম্প্রচারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রার্থনা করেন।

 

আদালত তার সেই আবেদন মঞ্জুর করলে টেলিভিশন পর্দায় দেশবাসী সরাসরি বিচারিক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। এদিকে, রায় ঘোষণার আগে বেলা এগারোটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে মামলার একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে উপস্থিত করা হয়।

 

বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালে কাঠগড়ায় তাকে বিমর্ষ অবস্থায় দেখা যায়। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপর চারজন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে আদালত সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

 

আদালতের রায়ে যে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে তারা হলেন- ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।

 

এই তিন শীর্ষ কর্মকর্তার নির্দেশে এবং প্রত্যক্ষ মদদে রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সাধারণ ছাত্র ও জনতার ওপর নির্মম ও পৈশাচিক হামলা চালানো হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া রামপুরা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তিনিও এই মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

 

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে এই কর্মকর্তারা নিজেদের শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং নিরীহ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

 

প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপন করা তথ্য এবং মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন রাজধানীর রামপুরা সংলগ্ন বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে শুরু করে।

 

প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আমির হোসেন নামের এক তরুণ ঘটনাস্থলের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশের একটি দল অত্যন্ত আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করে। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই তরুণ ভবনের ছাদের কার্নিশের একটি লোহার রড ধরে শূন্যে ঝুলে থাকেন।

 

সেই অসহায় অবস্থাতেও এক পুলিশ সদস্য অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাকে লক্ষ্য করে পরপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন। সৌভাগ্যক্রমে আমির হোসেন প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি গুরুতর আঘাত পান। এই নির্মম দৃশ্যটি সেই সময়কার অমানবিকতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরার সময় এক আবেগঘন ও থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়। একই দিনে, অর্থাৎ ১৯ জুলাই বনশ্রী এবং এর আশপাশের এলাকায় পুলিশের চালানো নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনায় নাদিম এবং মায়া ইসলাম নামের আরও দুই নিরীহ ব্যক্তি মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।

 

তাদের এই অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই সকল ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আদেশ দিয়েছেন।

 

এই রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ন্যায়বিচারের এই রায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য একটি বড় ধরনের সান্ত্বনা হয়ে থাকবে। আগামী দিনগুলোতেও এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে সাধারণ মানুষ আশা প্রকাশ করেছেন।