মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রচারকারী গণমাধ্যমগুলোকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত সরকারের

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০২:৩১ পিএম

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রচারকারী গণমাধ্যমগুলোকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত সরকারের
ছবি: সংগৃহীত

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনো প্রকার বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেছে সরকার।

 

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে তার একটি সাক্ষাৎকার প্রচারের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেক্ষাপটে আইনি বিধিবিধান সমুন্নত রাখতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

 

মঙ্গলবার সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সরকারের এই সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

 

তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করা সম্পূর্ণভাবে আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থি একটি কাজ। একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রতিটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের উচিত বিদ্যমান আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থেকে এ ধরনের বিতর্কিত ও বেআইনি প্রচার থেকে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখা।

 

তিনি জানান, শেখ হাসিনার যেকোনো ধরনের বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার প্রচারের ওপর মহামান্য আদালতের আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু মাধ্যম যে আচরণ করেছে, তা অনভিপ্রেত।

 

সরকার প্রাথমিকভাবে এই বিষয়ে কোনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, তবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খুব দ্রুতই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কবার্তা পাঠানো হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

 

বর্তমান যুগের তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের বিষয়টি স্বীকার করে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, সাধারণ মানুষ চাইলেই বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কিংবা আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে অনেক তথ্য বা বক্তব্য জানতে পারে।

 

কিন্তু সেই যুক্তিতে দেশের অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমগুলোতে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে এ ধরনের বিষয়বস্তু প্রচার করার কোনো আইনগত বৈধতা তৈরি হয় না। তিনি দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা যত দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে, তত দিন এ ধরনের প্রচার নীতিগত ও আইনগতভাবে একেবারেই অনুচিত।

 

এরপরও যদি এই নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটে, তবে ভবিষ্যতে সরকার বাধ্য হয়ে আইনি কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। ‘রিফর্মড’ বা নতুন কোনো মোড়কে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার গুঞ্জন ও সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে উপদেষ্টা জানান, দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর যত দিন আইনি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, তত দিন তারা কোনোভাবেই মাঠে নামতে পারবে না।

 

‘রিফর্মড আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূল আওয়ামী লীগ’ বা অন্য যেকোনো ছদ্মনাম ব্যবহার করেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। সরকারের এই অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।

 

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের যে সংশোধিত বিধান রয়েছে, মূলত তা কার্যকর রেখেই দলটির সকল প্রকার কর্মসূচির ওপর এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত পরিমিত ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানান যে, এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র এখতিয়ার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের।

 

তবে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সরকারের সুস্পষ্ট মত হলো, দলটির সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর বর্তমান নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই বহাল থাকা উচিত।

 

অন্যদিকে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলই আনুষ্ঠানিকভাবে বা দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণ করছে না। অতীতে চেয়ারম্যান ও মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমান ব্যবস্থায় সেটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।

 

ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দলীয় পরিচয়ে এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে না। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি আরবি হরফে কালিমা লেখা সংবলিত পতাকা উত্তোলনের যে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়েও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন উপদেষ্টা।

 

তিনি জানান, এই ঘটনার পেছনের মূল উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। এর সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি জোরালোভাবে নিশ্চিত করেন। বরং সরকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ এ ধরনের ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ও ভুল বার্তা পৌঁছানোর সমূহ আশঙ্কা থাকে।

 

এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন রয়েছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবেও বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট মহলের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে বলে সরকার মনে করছে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

পরিশেষে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বর্তমান সরকার যে বদ্ধপরিকর, সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে সেটিই সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের আইন, বিচারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি শর্তহীন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রতিটি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

 

বিশেষ করে, একটি ক্রান্তিকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমগুলোকে তাদের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আরও বেশি দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ এবং সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।