শুক্রবার, ৩ জুলাই, তেহরানের সংসদ ভবনে স্থানীয় সময় এই আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের শীর্ষ সংসদীয় নেতৃত্বের এই সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করছে।
বৈঠকে উভয় দেশের স্পিকার পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়, সংসদীয় সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যৌথ ভূমিকার ওপর বিশদ আলোকপাত করেন।
এর আগে ইরানের সদ্যপ্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও ঐতিহাসিক জানাজা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব করতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদল তেহরানে এসে পৌঁছায়।
এই প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নীতি-নির্ধারক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
তেহরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি এই প্রতিনিধিদলকে ইরানের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত উষ্ণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়।
বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণকে ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক নিদর্শন হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় সূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার, ৪ জুলাই, রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক ও সুবিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে আয়াতুল্লাহ খামেনির মূল জানাজা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে। বিশ্বজুড়ে শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, শীর্ষ কূটনীতিক এবং বরেণ্য ধর্মীয় পণ্ডিতদের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক শেষ বিদায় অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যরা শনিবারের এই মূল জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেবেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর এবং প্রয়াত নেতার প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শেষে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলটির ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, রাজধানী তেহরানে কয়েক দিনব্যাপী এই সুদীর্ঘ জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার মরদেহ একটি রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক শোকযাত্রার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ শহরে নিয়ে যাওয়া হবে।
এরপর আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহাসিক শিয়া নগরী মাশহাদে অবস্থিত পবিত্র ইমাম রেজার মাজারে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তার মরদেহ সযত্নে সংরক্ষণ করার পর বর্তমানে এই অন্তিম যাত্রা সম্পন্ন করা হচ্ছে।
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর প্রধান রূপকার এবং ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করে আসছিলেন।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত তার নিজস্ব বাসভবনে ইসরায়েলি বাহিনীর এক আকস্মিক, অতর্কিত ও অত্যন্ত বিধ্বংসী বিমান হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের সাথে ৮৬ বছর বয়সে তিনি শাহাদতবরণ করেন।
তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের স্পিকারের সঙ্গে ইরানের স্পিকারের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি দুই দেশের সংসদীয় মৈত্রী ও পারস্পরিক সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।