মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটক ভেঙে পরীক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটক ভেঙে পরীক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা দেশব্যাপী স্থগিত ও সময়সূচি পুনর্নির্ধারণের দাবিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অভূতপূর্ব এবং চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

বন্যাদুর্গত এলাকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি ও মানবিক সংকটের কথা বিবেচনা না করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে আজ ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং চত্বরে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

 

শিক্ষা বোর্ডের নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ বৈঠক শেষে নিজেদের দাবির সপক্ষে কোনো সুস্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়ার অভিযোগ তুলে আজ বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

ঘটনার পরপরই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য ও দাঙ্গা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১১টা থেকে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয়ের সামনে সমবেত হতে শুরু করেন বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত সাধারণ পরীক্ষার্থী এবং সমর্থক শিক্ষার্থীরা।

 

তারা ব্যানার, ফেস্টুন হাতে নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের মানবিক বিপর্যয় ও পরীক্ষা স্থগিতের যৌক্তিক দাবি সংবলিত বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মুরাদপুর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় যান চলাচল বিঘ্নিত হয় এবং এক তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন যে, দেশের একটি বিশাল অঞ্চল যখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন পরীক্ষা আয়োজন করা কোনোভাবেই সংবেদনশীল প্রশাসনের কাজ হতে পারে না।

 

বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিকেল ৩টার দিকে সাধারণ আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল উদ্ভূত সংকট নিরসনে এবং নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করতে শিক্ষা বোর্ডের সচিবের কক্ষে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন।

 

তবে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পরীক্ষা স্থগিত কিংবা পুনর্নির্ধারণের মতো নীতিগত বিষয়ে বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ইতিবাচক আশ্বাস বা সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হন কর্মকর্তারা।

 

বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাইরে এসে সমবেত শিক্ষার্থীদের এই নেতিবাচক ফলাফলের কথা অবহিত করার সাথে সাথেই উপস্থিত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

 

নিজেদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষিত হয়েছে- এমন ক্ষোভ থেকে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা একপর্যায়ে শিক্ষা বোর্ডের প্রধান লৌহ ফটকটি জোরপূর্বক ভেঙে ফেলেন এবং চত্বরের ভেতরে প্রবেশ করেন।

 

এই সময় কার্যালয়ের সামনে থাকা বেশ কিছু নিরাপত্তামূলক ব্যারিকেড এবং অস্থায়ী স্থাপনা উপড়ে ফেলা ও ভাঙচুর করা হয়, যার ফলে সমগ্র শিক্ষা বোর্ড এলাকায় এক মারাত্মক ভীতিকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

 

ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে স্থানীয় থানা পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হন এবং শিক্ষার্থীদের শান্ত করার পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।

 

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংবাদমাধ্যমের কাছে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, ভয়াবহ বন্যার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাসমূহের অনেক পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে কোনোভাবেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি।

 

সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বাসাবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ার মতো এই চরম মানবিক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা পুরোপুরি অমানবিক ও অবিবেচনাপ্রসূত বলে আখ্যায়িত করেন।

 

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা সর্বোচ্চ বিবেচনা করে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণের জোর দাবি জানান তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয় এবং কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন।

 

পরবর্তী সময়ে পরিবেশ শান্ত করতে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কেবল চট্টগ্রাম নয়, বরং সমতার স্বার্থে সমগ্র দেশজুড়ে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা।

 

সচিব প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট করেন যে, এই ধরনের জাতীয় ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এককভাবে কোনো আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ডের পক্ষে নেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব নয়; বরং দেশের আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

 

তিনি আরও জানান যে, বৈঠক শেষে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা বোর্ডের প্রধান ফটকটি ভেঙে ফেলেন, যা বর্তমানে মেরামতের কাজ চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত অবহিত করার আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে আগামী আগামীকাল সকাল পর্যন্ত তাদের সব ধরনের আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।