মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের কারণেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায়, হাসনাত আবদুল্লাহ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের কারণেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায়, হাসনাত আবদুল্লাহ
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।

 

মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা ও পথসভা’ শীর্ষক এক বিশাল রাজনৈতিক জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের, বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার মতোই তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগের ওপর ভর করেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। তাই কোনোভাবেই এই শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই।

 

বক্তব্যের শুরুতেই হাসনাত আবদুল্লাহ চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চরম অদূরদর্শিতার কথা তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন রেখে বলেন, হাঁটু থেকে বুকসমান পানির মধ্যে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির মুখে ফেলে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অমানবিক।

 

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় শিক্ষার্থীদের এই বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার বিষয়টিকে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের চরম দায়িত্বহীনতা বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে জানান, এমন একটি ত্রুটিপূর্ণ ও অনিশ্চিত ব্যবস্থায় পরীক্ষা দেওয়ার সময় একজন তরুণ শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, তা নীতিনির্ধারকরা একবারও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করেননি।

 

বরং নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ভুলের জন্য ন্যূনতম দুঃখ প্রকাশের সৌজন্যটুকু না দেখিয়ে উল্টো শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত ও ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে চরম ধৃষ্টতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

 

শিক্ষামন্ত্রীর ওই বিতর্কিত মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে এনসিপি নেতা বলেন, যাদের আজ অত্যন্ত তাচ্ছিল্য করে ‘ফার্মের মুরগি’ বলা হচ্ছে, সেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে এসে বুক পেতে দেওয়ার কারণেই আজকের শিক্ষামন্ত্রী তার কাঙ্ক্ষিত পদবি পেয়েছেন।

 

তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও তীক্ষ্ণ ভাষায় বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক পটভূমির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুর্বার ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফলেই আজ শিলং থেকে ফিরে কেউ সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং লন্ডন থেকে দেশে ফিরে একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হচ্ছেন।

 

দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাগারের ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি গুরুতর অভিযোগ করেন, নীতিনির্ধারকরা নিজেদের সন্তানদের বিদেশে নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশে পড়াশোনা করান বলেই দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও জীবন নিয়ে এমন বিপজ্জনক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।

 

সমাবেশে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও সাংবিধানিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, সংবিধান সংস্কার কমিটির কোনো বৈধতা বর্তমান সংবিধানে নেই।

 

এর জবাবে হাসনাত আবদুল্লাহ অকাট্য যুক্তি তুলে ধরে বলেন, যদি কেবল সংবিধানের দোহাই দেওয়া হয়, তবে ২০২৬ সালের বর্তমান নির্বাচনও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ছিল না, কারণ পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

 

তিনি সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ছাত্র-জনতা যদি এই প্রচলিত সংবিধানের কাঠামোর বিরুদ্ধে গিয়ে রাজপথে না নামত এবং নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি না করত, তবে আজ তারা ক্ষমতার স্বাদ পেতেন না।

 

ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলেই বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ এখন তারা সেই জনগণেরই বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

 

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কক্সবাজার, সাতকানিয়া, আনোয়ারা ও বাঁশখালীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ভয়াবহ বন্যার পানিতে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করছেন।

 

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করলেও এখনো পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ও কার্যকর ত্রাণ সহায়তা না পৌঁছানোকে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের দুর্নীতি, লাগামহীন চাঁদাবাজি এবং অবৈধ ভূমি দখলের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হন। সোনারগাঁয়ের স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সুস্পষ্ট অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমপির ছেলে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করেছে এবং এর দায়ে তাকে থানায় গিয়ে মুচলেকা দিয়ে ছাড় পেতে হয়েছে, যা জনপ্রতিনিধিদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

 

এছাড়া সারা দেশে যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, ঠিক সেই সময়ে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ সংযোগ নিয়ে কিছু কারখানা মালিক হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ করেন।

 

বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী শত শত মাইল সাধারণ মানুষের আবাদি জমি অবৈধভাবে দখল করছে এবং কিছু অনুগত গণমাধ্যম তাদের এই অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

রাজনৈতিক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় এমপিদের চাঁদা হিসেবে দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষ ২০০ টাকা আয় করলে সেখান থেকে ৫০ টাকাই চাঁদা দিতে হয়।

 

এই চাঁদাবাজির রাজনীতির দিন শেষ হয়ে এসেছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে হয়তো ১৭ বছর লেগেছিল, কিন্তু নতুন বাংলাদেশে অন্যায়কে আর দীর্ঘ সময় প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

 

প্রতি বছর হয়তো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হয় না, কিন্তু যখন সাধারণ মানুষ ফের জেগে উঠবে, তখন এই দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজরা পালানোর কোনো পথই খুঁজে পাবে না। পথসভার শেষ পর্যায়ে হাসনাত আবদুল্লাহ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণা করে রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দেন।

 

তিনি সোনারগাঁ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে তুহিন মাহমুদ, সোনারগাঁ পৌরসভার মেয়র পদে মোস্তফা এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে শাকিল সাইফুল্লাহর নাম ঘোষণা করে স্থানীয় জনগণের কাছে তাদের জন্য সর্বাত্মক সমর্থন ও ভোট প্রার্থনা করেন।