এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার এবং অবিলম্বে নিজেদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ও জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের এই প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্যোগ মোকাবিলা করে কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে খোদ সরকার শিক্ষার্থীদের চেয়েও বহুগুণ বেশি চিন্তিত ও তৎপর রয়েছে।
একই সঙ্গে যেসব নির্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মারাত্মক সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের সুস্পষ্ট সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি দেশের আপামর ছাত্রসমাজকে আশ্বস্ত করেছেন।
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করে শিক্ষামন্ত্রী দেশের এই সমসাময়িক ও স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন।
এদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনটি শুরু হয় মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে। সংসদীয় কার্যপ্রণালী চলাকালে সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের উত্থাপিত এক সময়োপযোগী সম্পূরক প্রশ্নের বিস্তারিত ও গঠনমূলক জবাব দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উল্লিখিত আশ্বাস ও দিকনির্দেশনামূলক কথাগুলো বলেন।
দেশব্যাপী পরীক্ষা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনে এবং সরকারের নেওয়া নানামুখী উদ্যোগ সম্পর্কে জাতিকে অবহিত করতেই মন্ত্রী এই বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
সংসদে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত খোলামেলাভাবে জানান যে, ভরা বর্ষা মৌসুমে জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন করা নিয়ে সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই যথেষ্ট চিন্তিত ও সতর্ক ছিল।
মূলত আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো থেকে আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকবে বলে যে প্রাথমিক পূর্বাভাস প্রদান করা হয়েছিল, সেই নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার পূর্বনির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা চালু রাখার একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
তবে প্রকৃতির আকস্মিক বৈরী আচরণের কারণে উদ্ভূত এই জটিল ও সংকটজনক পরিস্থিতি অত্যন্ত সুচারুভাবে সামাল দিতে এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে একটি সার্বক্ষণিক ও নিবিড় মনিটরিং ব্যবস্থা বা পর্যবেক্ষণ সেল চালু রেখেছে।
এই সেলের মাধ্যমে সারাদেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরীক্ষা চলাকালীন দেশের যেকোনো প্রান্তের কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে বন্যার পানি প্রবেশ করার বা পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও সর্বাত্মক সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ বিকল্প কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়ে পরীক্ষা গ্রহণের কার্যকরী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন বন্যাকবলিত অঞ্চল, বিশেষ করে কুমিল্লা ও এর আশপাশের পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি সংসদকে অবহিত করেন যে, কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষাকেন্দ্রে বন্যার পানি উঠলেও প্রশাসন ও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের সম্মিলিত ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলে সেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আনুষঙ্গিক সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনের কোনো প্রকার গাফিলতি, সমন্বয়হীনতা বা অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়ে থাকে বা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য যাচাই-বাছাই করে ওই নির্দিষ্ট কেন্দ্রে বা নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় পুরো জাতিকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেন যে, এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সম্পূর্ণ নতুন ও বিকল্প প্রশ্নপত্র সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা আছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি চলমান বৈরী পরিস্থিতির সার্বিক দিক সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনস্থ পরীক্ষার্থীদের জন্য এরই মধ্যে যেভাবে বিশেষ ও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে আগামী দিনগুলোতেও দেশের যেকোনো ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্যাকবলিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কল্যাণে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের জন্য সরকার নীতিগতভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। এটি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রতি রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান দায়বদ্ধতা।
পরিশেষে, রাজপথে নেমে আসা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের পথ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পুনরায় পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ দেওয়ার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন ও পিতৃতুল্য এক তাগিদ দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি বলেন, আজকের এই তরুণ শিক্ষার্থীরাই হলো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির আগামী দিনের কাণ্ডারি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তাদের কোনোভাবেই ন্যায্য অধিকার বা মেধার সঠিক মূল্যায়ন থেকে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত করা হবে না।
দেশের যেকোনো প্রতিকূল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুষিয়ে দিতে এবং তাদের একটি বাধাহীন সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রয়োজনীয়, বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত রাজপথের উত্তাপ ছেড়ে অবিলম্বে নিজেদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা।