মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, একজনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, একজনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে বহুল আলোচিত এবং দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি (মুরারিচাঁদ) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার চূড়ান্ত রায় মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ঘোষণা করা হয়েছে।

 

বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথপরিক্রমা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে পৈশাচিক এই ঘটনার মূল হোতাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

 

এছাড়া, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় চারজনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত এবং খালাসপ্রাপ্ত সকল আসামিই নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী বলে আদালত এবং তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রায় একটি যুগান্তকারী ও সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা। মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এজলাসে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় পড়া শুরু হয়।

 

আদালত প্রাঙ্গণে এ সময় উৎসুক জনতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক স্বপন কুমার সরকার ৯১ পৃষ্ঠার এক সুদীর্ঘ ও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ পাঠ শেষে এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন গণমাধ্যমের কাছে রায়ের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাইফুর রহমান সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়া গ্রামের মো. তাহিদ মিয়ার ছেলে। তার অপরাধের মাত্রা, পূর্বপরিকল্পনা এবং ঘটনার ভয়াবহতা গভীরভাবে বিবেচনা করে আদালত এই দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ সাজার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

অন্যদিকে, একই বর্বরোচিত অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক এবং অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। যাবজ্জীবনের পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

 

রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অপর একটি সংশ্লেষী ধারায় এই তিন আসামিকে অতিরিক্ত ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। তবে বিজ্ঞ আদালত তার আদেশে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আসামিদের এই উভয় সাজা একইসঙ্গে কার্যকর হবে।

 

মামলার অপর চার আসামি-রবিউল হাসান ওরফে ইসলাম, মাহফুজ রহমান মাসুম, মো. আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল এবং মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।

 

ফলশ্রুতিতে আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিচারক তার লিখিত আদেশে উল্লেখ করেন, যদি এই চারজনের বিরুদ্ধে অন্য কোনো আদালতে কোনো বিচারাধীন মামলা না থাকে, তবে তাদের অবিলম্বে কারামুক্তির নির্দেশ দেওয়া হলো।

 

এর আগে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ৮ জুলাই আসামিপক্ষ এবং রাষ্ট্রপক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণার জন্য ১৪ জুলাই দিন ধার্য করেছিলেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার এই যাত্রায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৫ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করে।

 

সাক্ষীদের এই তালিকায় ছিলেন চরম অমানবিকতার শিকার সেই তরুণী ও তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, এমসি কলেজের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

 

তাদের বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে সিলেটের শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক ভয়াবহ, অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে।

 

ওই দিন সন্ধ্যায় ঘুরতে আসা এক নববিবাহিত দম্পতিকে জোরপূর্বক জিম্মি করে ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে বেঁধে রেখে তার সামনেই ওই তরুণীকে পাশবিক কায়দায় সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে আসামিরা।

 

এই পৈশাচিক ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বাদী হয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় আটজনকে আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায় পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের যৌথ চিরুনি অভিযানে অভিযুক্ত আটজনকেই গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

 

পরবর্তী সময়ে নিবিড় তদন্ত চলাকালে কয়েকজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদান করেন। এছাড়া মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষায় ছয়জন আসামির সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের সরাসরি মিল পাওয়া যায়, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং অপরাধীদের শনাক্তকরণে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

 

দীর্ঘ ও নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধেই আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে দেশবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত এই মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।