তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয়, সাবলীল অভিব্যক্তি এবং নিজস্ব রসিক স্বভাব দর্শকদের সব সময়ই বিপুলভাবে বিনোদিত করে এসেছে। কিন্তু স্বভাবসুলভ সেই উচ্ছল ও প্রাণচঞ্চল মানুষটির ব্যক্তিজীবনে এবার আকস্মিকভাবেই নেমে এসেছে ঘোর বিষাদের এক দীর্ঘ ছায়া।
অত্যন্ত কাছের এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এক সঙ্গীকে চিরতরে হারিয়ে বর্তমানে গভীরভাবে শোকস্তব্ধ ও মর্মাহত হয়ে পড়েছেন এই গুণী অভিনেতা। প্রিয় পোষ্যের মৃত্যুতে তাঁর এমন আকস্মিক ভেঙে পড়ার ঘটনা বিনোদন জগতের অনেককেই আবেগাপ্লুত করেছে এবং ভক্তদের মনেও গভীর রেখাপাত করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম এবং অভিনেতার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী জানা যায়, অঙ্কুশ তাঁর অত্যন্ত আদরের এবং পরম স্নেহের প্রিয় পোষ্য ‘বাবলা’-কে চিরতরে হারিয়েছেন।
প্রাণীজগতের সঙ্গে, বিশেষ করে মানুষের সঙ্গে পোষ্য প্রাণীর যে এক নিবিড়, আত্মিক ও সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অঙ্কুশ এবং বাবলার মধ্যকার বন্ধনটি ছিল ঠিক তারই এক অনন্য ও চমৎকার উদাহরণ।
দীর্ঘ একটি সময় ধরে এই পোষ্যটি ছিল অভিনেতার রোজকার ব্যস্ত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাঁর সমস্ত আনন্দ, অবসাদ ও অবসরের একনিষ্ঠ নিত্যসঙ্গী। শুটিংয়ের ক্লান্তি শেষে বাড়ি ফেরার পর এই পোষ্যের সান্নিধ্যই তাঁকে সতেজতা প্রদান করত।
তাই এই অকাল বিচ্ছেদ অঙ্কুশকে মানসিকভাবে ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত ও নিঃস্ব করে তুলেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী বার্তার মাধ্যমে তিনি নিজেই ভক্ত ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীদের কাছে বাবলার মৃত্যুর এই হৃদয়বিদারক সংবাদটি ভারাক্রান্ত মনে নিশ্চিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই বিশেষ শোকবার্তায় প্রিয় পোষ্যকে হারানোর তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, হাহাকার ও জীবনের এক বিশাল শূন্যতা গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে অঙ্কুশের লেখায়। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে লিখেছেন, “আজ আমি আমার গোটা পৃথিবীটাকে হারিয়ে ফেললাম।
আমার জীবন, আমার অস্তিত্বের প্রায় সবকিছুই যেন আজ হারিয়ে গেল। শান্তিতে অনন্তকাল ঘুমাও বাবলা। এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড়, কঠিন এবং দুরূহ চ্যালেঞ্জ হলো তোমাকে ছাড়া বাকি জীবনটা একাকী অতিবাহিত করা।”
বিচ্ছেদের এই শোক ও যন্ত্রণা এতটাই গভীর যে, আবেগতাড়িত হয়ে অভিনেতা তাঁর প্রিয় সঙ্গীর পৃথিবীতে পুনর্জন্মও কামনা করেছেন। তিনি তাঁর সেই দীর্ঘ শোকবার্তার শেষাংশে পরম মমতায় আরও যুক্ত করে লেখেন, “দয়া করে তুমি আবার পুনর্জন্ম নিয়ে আমার জীবনে ফিরে এসো।
তোমাকে সব সময়ই বুকের গভীরে ভালোবাসব আমার আদরের সোনা।” জনপ্রিয় এই তারকার এমন মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর লেখা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমের অগুনতি ভক্তদের হৃদয় প্রবলভাবে ছুঁয়ে যায়।
জনপ্রিয় এই তারকার এমন দুঃসময়ে এবং গভীর শোকের এই চরম বেদনাবিধুর মুহূর্তে বিনোদন জগতের সহকর্মীরাও তাঁর পাশে এসে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। টলিউডের পরিচিত মুখ এবং তাঁর অনেক সহশিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে তাঁকে সান্ত্বনা ও মানসিক সমর্থন দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
অঙ্কুশের ওই আবেগময় পোস্টে গভীর সমবেদনা জানিয়ে অভিনেতা জন আন্তরিকভাবে মন্তব্য করেছেন, “বাবলার আত্মার চিরশান্তি কামনা করি বন্ধু। ও শারীরিকভাবে না থাকলেও সব সময় তোমার সঙ্গেই থাকবে এবং মধুর স্মৃতি হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।”
শুধু বিনোদন অঙ্গনের তারকারাই নন, দেশ-বিদেশের অগুনতি সাধারণ ভক্ত ও অনুসারীরাও মন্তব্য বক্সে তাঁদের প্রিয় অভিনেতাকে এই শোক সামলে ওঠার জন্য মানসিক শক্তি জোগাতে নিরন্তর সহানুভূতিশীল বার্তা দিয়ে চলেছেন।
এই কঠিন সময়ে সবার এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা এটাই প্রমাণ করে যে, একজন শিল্পীর মানবিক ও ব্যক্তিগত দিকগুলো সাধারণ মানুষের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম। ব্যক্তিগত জীবনের এই গভীর বিষাদ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা ও বিশাল শূন্যতার পাশাপাশি অভিনেতার পেশাগত জীবনের দিক দিয়েও সাম্প্রতিক সময়টা খুব একটা মসৃণ বা অনুকূল যাচ্ছে না বলে স্পষ্টভাবে মনে করছেন চলচ্চিত্র সমালোচক ও বিশ্লেষকেরা।
একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পীর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত ও পেশাগত উত্থান-পতন খুবই স্বাভাবিক ও চিরচেনা একটি প্রক্রিয়া, তবে অঙ্কুশের জন্য বর্তমান সময়টি যেন চতুর্দিক থেকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকট নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
গণমাধ্যম ও বক্স অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে, গত ৯ জানুয়ারি ভারতের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে বেশ ঘটা করেই মুক্তি পেয়েছিল অঙ্কুশ হাজরা অভিনীত সম্পূর্ণ নতুন চলচ্চিত্র ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’।
মুক্তির আগে এই ছবিটি নিয়ে দর্শকদের মাঝে বেশ ভালো মাত্রায় প্রত্যাশা ও আগ্রহ থাকলেও, মুক্তির পর তা বক্স অফিসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে চরমভাবে হোঁচট খায়।
প্রেক্ষাগৃহে সাধারণ দর্শকদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া ও ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ার পর, দর্শকদের কাছে চলচ্চিত্রটি ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প এবং আধুনিক মাধ্যম হিসেবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায়, গত জুন মাসে জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘জি-ফাইভ বাংলা’-এর মাধ্যমে সিনেমাটির স্ট্রিমিং বা বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার শুরু হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে নতুন করে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ পেলেও, প্রেক্ষাগৃহের প্রাথমিক ব্যর্থতা অভিনেতার ক্যারিয়ার গ্রাফে সাময়িকভাবে হলেও একটি স্থবিরতা বা ধীরগতি তৈরি করেছে।
একদিকে বক্স অফিসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের অভাবজনিত পেশাগত হতাশা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরম আদরের পোষ্য বাবলার চিরবিদায়-সব মিলিয়ে অঙ্কুশ হাজরার জীবন বর্তমানে এক চরম আবেগিক ও পেশাগত কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা গভীরভাবে আশা করছেন, শোক ও হতাশার এই ঘন কালো মেঘ খুব দ্রুত কাটিয়ে তিনি আবারও তাঁর পুরনো ও চেনা রূপে, স্বমহিমায় রূপালি পর্দায় সদর্পে ফিরে আসবেন।